হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীতে ভগবান শ্রীগণেশের মস্তক হাতির মতো হওয়ার পেছনে কয়েকটি বেশ জনপ্রিয় ও প্রচলিত গল্প রয়েছে। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য গল্পটি শিবপুরাণ এবং দেবীভাগবত পুরাণে পাওয়া যায়।
ঘটনাটি সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরা হলো:
পার্বতী কর্তৃক গণেশের সৃষ্টি: দেবী পার্বতী যখন স্নান করতে যাচ্ছিলেন, তখন নিজের ঘরের পাহারা দেওয়ার জন্য তিনি তাঁর গায়ের চন্দনের প্রলেপ দিয়ে একটি বালকের রূপ তৈরি করেন এবং তাতে প্রাণ সঞ্চার করেন। এই বালকই ছিলেন গণেশ। পার্বতী তাঁকে আদেশ দেন যেন তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ ঘরে প্রবেশ করতে না পারে।
শিবের সাথে সংঘাত: ঠিক সেই সময়ে ভগবান শিব সেখানে আসেন। কিন্তু শিবকে না চেনার কারণে বালক গণেশ তাঁকে ঘরের ভেতর যেতে বাধা দেন। এতে শিবের অনুচর ও দেবগণের সাথে বালকের ভীষণ যুদ্ধ বাঁধে। গণেশ সবাইকে পরাজিত করলে ক্ষুব্ধ হয়ে ভগবান শিব তাঁর ত্রিশূল দিয়ে বালকের মস্তক ছেদন করেন।
পার্বতীর রূদ্ররূপ: পুত্রকে হারিয়ে দেবী পার্বতী অত্যন্ত শোকাহত ও ক্রুদ্ধ হন এবং সৃষ্টি ধ্বংস করতে উদ্যত হন। তখন পরিস্থিতি শান্ত করতে ভগবান শিব ও অন্যান্য দেবতারা বালককে পুনরায় জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেন।
উত্তর দিকে মাথা রাখা জীব: শিবের আদেশে অনুচররা (গণ) বের হন এমন কোনো জীবের মাথার খোঁজে, যার মা তার দিকে পিঠ দিয়ে ঘুমিয়ে আছে এবং যার মাথা উত্তর দিকে রয়েছে। তাঁরা প্রথমেই একটি হস্তিশাবক বা হাতিকে এ অবস্থায় পান এবং তার মস্তক কেটে নিয়ে আসেন।
পুনরুজ্জীবন: শিব সেই হাতির মাথাটি বালকের স্কন্ধে বসিয়ে তাঁকে পুনর্জীবিত করেন এবং তিনি 'গজানন' (হাতির মুখ যার) নামে পরিচিত হন। এরপর শিব তাঁকে সকল গণের অধিপতি বা 'গণেশ' হিসেবে ঘোষণা করেন।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের ভিন্নমত
অন্য একটি প্রচলিত কাহিনী অনুসারে, গণেশের জন্মের পর শনিদেব তাঁকে দেখতে আসেন। শনিদেবের দৃষ্টির তীব্র প্রভাব বা অভিশাপের কারণে শিশুর মস্তক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তীতে বিষ্ণুদেব একটি হাতির মাথা এনে তা বালকের দেহে যুক্ত করে তাঁকে রক্ষা করেন।
এর প্রতীকী বা দার্শনিক অর্থ
পৌরাণিক গল্পের আড়ালে এর একটি গভীর আধ্যাত্মিক অর্থও রয়েছে:
হাতির মাথা: হাতি হলো বুদ্ধিমত্তা, শক্তি, ধীরস্থিরতা এবং পরম জ্ঞানের প্রতীক। গণেশের বিশাল মাথা ইঙ্গিত করে যে মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা ও বুদ্ধি হওয়া উচিত বিশাল।
বড় কান: বেশি শোনার এবং অন্যের কথা মন দিয়ে শোনার প্রতীক।
ছোট চোখ: কোনো বিষয়কে গভীরভাবে ও মনোযোগের সাথে দেখার প্রতীক।
মূলত এই কাহিনীর মাধ্যমে শক্তির চেয়ে বুদ্ধি ও মাতৃভক্তির মহিমাকে উপরে তুলে ধরা হয়েছে।


