গোস্বামী মত বলতে মূলত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রবর্তিত এবং বৃন্দাবনের ছয় গোস্বামী কর্তৃক সুসংবদ্ধ গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনকে বোঝায়। ১৫শ শতাব্দীতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যে ভক্তি আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তাকে শাস্ত্রীয় ও দার্শনিক ভিত্তি দান করেছিলেন এই ছয়জন গোস্বামী।
নিচে গোস্বামী মতের মূল বিষয়গুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো —
১. বৃন্দাবনের ছয় গোস্বামী কারা?
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশে বৃন্দাবনে গিয়ে যারা গৌড়ীয় বৈষ্ণব শাস্ত্র রচনা ও লুপ্ত তীর্থ উদ্ধার করেছিলেন, তারা হলেন —
শ্রী রূপ গোস্বামী
শ্রী সনাতন গোস্বামী
শ্রী রঘুনাথ ভট্ট গোস্বামী
শ্রী গোপাল ভট্ট গোস্বামী
শ্রী রঘুনাথ দাস গোস্বামী
শ্রী জীব গোস্বামী
২. মূল দর্শন: অচিন্ত্য-ভেদাভেদ তত্ত্ব
গোস্বামী মতের প্রধান দার্শনিক ভিত্তি হলো 'অচিন্ত্য-ভেদাভেদ'। এর অর্থ হলো—ভগবান (শ্রীকৃষ্ণ) এবং তাঁর সৃষ্টি বা জীবের মধ্যে একই সঙ্গে ভেদ (পার্থক্য) এবং অভেদ (একতা) বিদ্যমান। এটি মানুষের বুদ্ধির অতীত, তাই একে 'অচিন্ত্য' বলা হয়।
যেমন: সূর্যের আলো সূর্যের চেয়ে আলাদা নয়, আবার আলো নিজেই পূর্ণ সূর্যও নয়।
৩. উপাস্য ও উপাসনা (পঞ্চতত্ত্ব)
এই মতে শ্রীকৃষ্ণকে 'স্বয়ং ভগবান' এবং পরম সত্য হিসেবে মান্য করা হয়। গোস্বামীরা শিখিয়েছেন যে, শুষ্ক জ্ঞান বা কঠোর তর্পস্যার চেয়ে 'ভক্তি' বা প্রেমের মাধ্যমেই ভগবানকে পাওয়া সহজ। তাদের মতে, সাধ্য বা জীবনের চরম লক্ষ্য হলো কৃষ্ণপ্রেম।
৪. ভক্তির স্তর (অভিধেয়)
গোস্বামী মতে ভক্তির নয়টি প্রকার (নবধা ভক্তি) থাকলেও তারা 'নাম সংকীর্তন' বা হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপকে কলিযুগের শ্রেষ্ঠ ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। শ্রী রূপ গোস্বামী তাঁর 'ভক্তিরসামৃতসিন্ধু' গ্রন্থে ভক্তির বিজ্ঞানসম্মত ধাপগুলো ব্যাখ্যা করেছেন।
৫. গোস্বামী মতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য
বৈরাগ্য ও পণ্ডিত্যের সমন্বয়: গোস্বামীরা রাজকীয় জীবন ত্যাগ করে বৃন্দাবনে অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপন করতেন, কিন্তু তারা ছিলেন অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী।
শাস্ত্রীয় প্রামাণ্যতা: তারা কেবল আবেগের ওপর ভিত্তি করে ভক্তি প্রচার করেননি; বরং বেদ, পুরাণ ও উপনিষদ থেকে প্রমাণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে কৃষ্ণভক্তিই পরম ধর্ম।
রস তত্ত্ব: ভক্তি যে একটি রস (যেমন: শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মাধুর্য), এই ধারণাটি গোস্বামী মতেরই অবদান। এর মধ্যে 'মাধুর্য রস' বা রাধা-কৃষ্ণের প্রেমতত্ত্বকে তারা সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন।
৬. প্রাত্যহিক আচরণ (স্মৃতি শাস্ত্র)
শ্রী গোপাল ভট্ট গোস্বামী তাঁর 'হরিভক্তিবিলাস' গ্রন্থে বৈষ্ণবদের দৈনিক আচার-আচরণ, তিলক ধারণ, একাদশী পালন এবং মন্দির পরিচালনার নিয়মাবলী লিপিবদ্ধ করেছেন, যা আজও ইসকনসহ সকল গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ অনুসরণ করে।
গোস্বামী মত হলো ভক্তিকে একটি সুশৃঙ্খল বিজ্ঞানে রূপান্তর করা। এটি শেখায় যে, ঘৃণা বা বিভেদ নয়, বরং বিশুদ্ধ প্রেমের মাধ্যমেই পরমেশ্বরকে লাভ করা সম্ভব।


