নবদুর্গা হলো দেবী দুর্গার নয়টি বিশেষ রূপ, যা তিনি মহিষাসুর বধের সময় ধারন করেছিলেন। 'নব' শব্দের অর্থ 'নয়' এবং 'দুর্গা' হলেন 'দেবী শক্তি'।
শারদীয় বা বাসন্তী দুর্গাপূজার সময় নবরাত্রির ৯ দিনে প্রতিদিন দেবী দুর্গার এক-একটি রূপের আরাধনা করা হয়। মহিষাসুর বধের উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সুরক্ষায় দেবী দুর্গা এই নয়টি ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করেছিলেন।
নবদুর্গার ৯টি রূপ ও তাঁদের তাৎপর্য নিচে আলোচনা করা হলো —
১. শৈলপুত্রী (১ম দিন):
'শৈল' অর্থ পর্বত। পর্বতরাজ হিমালয়ের কন্যা হিসেবে জন্ম নেওয়ার কারণে তিনি শৈলপুত্রী। তাঁর বাহন ষাঁড় (বৃষ)। এক হাতে ত্রিশূল ও অন্য হাতে পদ্ম থাকে। তিনি প্রকৃতি ও পর্বতের শক্তির প্রতীক।
২. ব্রহ্মচারিণী (২য় দিন): 'ব্রহ্ম' অর্থ তপস্যা। শিবকে পতি হিসেবে পাওয়ার জন্য দেবী কঠোর তপস্যা করেছিলেন, তাই তিনি ব্রহ্মচারিণী। তিনি খালি পায়ে হাঁটেন। এক হাতে জপমালা এবং অন্য হাতে কমণ্ডুলু ধারণ করেন। তিনি জ্ঞান, নিষ্ঠা ও ত্যাগের প্রতীক।
৩. চন্দ্রঘণ্টা (৩য় দিন): তাঁর কপালে ঘণ্টার মতো অর্ধচন্দ্র শোভা পায় বলে তিনি চন্দ্রঘণ্টা। তাঁর বাহন বাঘ (বা সিংহ)। তিনি দশভুজা এবং হাতে বিভিন্ন অস্ত্র থাকে। তিনি শান্তি ও বীরত্বের প্রতীক।
৪. কূষ্মাণ্ডা (৪র্থ দিন): 'কূ' অর্থ ইষৎ, 'উষ্মা' অর্থ তাপ বা শক্তি এবং 'অণ্ড' অর্থ মহাজাগতিক ডিম্ব (বিশ্বব্রহ্মাণ্ড)। তাঁর মৃদু হাসির মাধ্যমেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। তাঁর আটটি হাত (অষ্টভুজা) এবং বাহন সিংহ। তিনি আলো ও সৃষ্টির উৎস।
৫. স্কন্দমাতা (৫ম দিন): ভগবান কার্তিক যাঁকে 'স্কন্দ' বলা হয় - তাঁর মাতা হওয়ার কারণে তিনি স্কন্দমাতা। কোলে শিশু স্কন্দ (কার্তিক) বসে থাকেন, বাহন সিংহ। তিনি মাতৃত্ব, স্নেহ ও বাৎসল্য রসের প্রতীক।
৬. কাত্যায়নী (৬ষ্ঠ দিন): মহর্ষি কাত্যায়নের আশ্রমে দেবী প্রকটিত হয়েছিলেন এবং তিনি দেবীকে পুজো করেছিলেন বলে নাম কাত্যায়নী। মহিষাসুর বধের জন্য এই রূপের বিশেষ ভূমিকা ছিল। চতুর্ভুজা, হাতে তলোয়ার ও পদ্ম এবং বাহন সিংহ। তিনি ধার্মিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রতীক।
৭. কালরাত্রি (৭ম দিন): তিনি দুর্গার সবচেয়ে ভয়াল ও রৌদ্র রূপ। সমস্ত অজ্ঞতা, অন্ধকার ও অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে তিনি এই রূপ নেন। তাঁর গায়ের রং গাঢ় অন্ধকার রাত বা মেঘের মতো কালো, এলোকেশ, বাহন গাধা (গর্দভ)। তিনি ভক্তদের জন্য 'শুভঙ্করী' (শুভ ফলদাত্রী)।
৮. মহাগৌরী (৮ম দিন): কঠোর তপস্যার পর শিবের কৃপায় দেবী অত্যন্ত উজ্জ্বল ও ফর্সা রূপ লাভ করেন, তাই তিনি মহাগৌরী (মহা + গৌরী/শ্বেতবর্ণ)। এই রূপে তিনি শ্বেতবস্ত্র পরিহিতা, এবং বাহন ষাঁড়। তিনি পবিত্রতা, করুণা ও শান্তির প্রতীক।
৯. সিদ্ধিদাত্রী (৯ম দিন): ইনি সর্বপ্রকার সিদ্ধি (অলৌকিক ক্ষমতা, সাফল্য ও জ্ঞান) প্রদানকারী। তিনি পদ্মফুলের ওপর উপবিষ্ট, চার হাতে চাকা (চক্র), শঙ্খ, গদা ও পদ্ম ধরে আছেন। তিনি সিদ্ধি ও মোক্ষদাত্রী।
দুর্গাপূজা বা নবরাত্রির প্রতিটি দিনে নবদুর্গার নির্দিষ্ট রূপের পূজা করে ভক্তরা শক্তি, জ্ঞান, সুখ এবং অশুভ শক্তি থেকে মুক্তির আশীর্বাদ লাভ করেন।
মানব চেতনার বিকাশ এবং ভেতরের কুপ্রবৃত্তি (কাম, ক্রোধ, লোভ, অহংকার) দমন করে পরম সিদ্ধি লাভের ৯টি ধাপ হিসেবেও নবদুর্গাকে ব্যাখ্যা করা হয়।


