ইসকনের ভক্ত বা সাধুদের জীবনযাত্রায় খাদ্যাভ্যাস নিয়ে যে কড়াকড়ি দেখা যায়, তার পেছনে কোনো পারিবারিক ঘৃণা বা অবজ্ঞা নেই; বরং এর মূল কারণ হলো তাদের 'দীক্ষা' এবং 'সাত্ত্বিক আহার' সংক্রান্ত শাস্ত্রীয় নিয়ম। বিষয়টির সত্যতা এবং এর পেছনের দার্শনিক কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো —
১. প্রসাদ ও সাত্ত্বিকতার নিয়ম
ইসকনের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন যে, যা কিছু খাওয়া হবে তা আগে ভগবানকে নিবেদন করতে হবে (যাকে 'প্রসাদ' বলা হয়)। ভগবানকে নিবেদন করার জন্য খাবারটি হতে হবে সম্পূর্ণ নিরামিষ এবং পেঁয়াজ-রসুন মুক্ত। যদি কোনো মা নিরামিষাশী না হন বা রান্নায় পেঁয়াজ-রসুন ব্যবহার করেন, তবে সেই খাবার ভগবানকে নিবেদন করা সম্ভব হয় না। আর অর্পণ না করা খাবার (যাকে তারা 'ভোগ' বা সাধারণ অন্ন বলেন) দীক্ষিত ভক্তরা গ্রহণ করেন না।
২. রান্নার শুচিতা (চেতনা)
বৈষ্ণব দর্শনে মনে করা হয়, রান্নার সময় পাচক বা রাঁধুনির *চেতনা** খাবারের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই নিয়ম হলো—যিনি রান্না করবেন, তাকে অবশ্যই ভক্ত হতে হবে এবং স্নান সেরে পবিত্র অবস্থায় ভগবানের স্মরণে রান্না করতে হবে। যদি পরিবারের সদস্যরা (মা বা অন্য কেউ) ইসকনের এই কঠোর নিয়মগুলো (যেমন স্নান করে রান্না করা বা নির্দিষ্ট মন্ত্র পড়া) পালন না করেন, তবে ভক্তরা সেই খাবার গ্রহণ করতে দ্বিধাবোধ করেন।
৩. দীক্ষার শপথ
ইসকনে দীক্ষা নেওয়ার সময় ভক্তরা চারটি প্রধান নিয়ম পালনের শপথ নেন (আমিষ বর্জন, নেশা বর্জন, অবৈধ সঙ্গ বর্জন এবং জুয়া বর্জন)। অনেক সময় পরিবারে আমিষ রান্না হওয়ার কারণে রান্নার বাসনপত্র বা পরিবেশ তাদের শপথের অনুকূলে থাকে না। এই 'শপথ' রক্ষার খাতিরেই অনেকে মায়ের হাতের রান্না এড়িয়ে চলেন যদি না মা নিজে নিরামিষাশী এবং দীক্ষিত হন।
৪. এটি কি সবার জন্য প্রযোজ্য?
না, এটি সবার জন্য এক নয়। যারা মন্দিরে পূর্ণকালীন ব্রহ্মচারী হিসেবে থাকেন, তাদের নিয়ম অত্যন্ত কঠোর। কিন্তু যারা গৃহস্থ ভক্ত (সংসারে থাকেন), তারা সাধারণত বাড়িতে মা বা স্ত্রীকে নিরামিষ রান্নায় উৎসাহিত করেন এবং সেই খাবারই প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে মা যখন দেখেন সন্তান আমিষ বা পেঁয়াজ-রসুন খাচ্ছে না, তখন তিনি নিজেই সন্তানের জন্য আলাদা করে সাত্ত্বিক রান্না করে দেন।
৫. দৃষ্টিভঙ্গির ভুল ব্যাখ্যা
বাইরে থেকে মনে হতে পারে তারা মাকে অসম্মান করছে, কিন্তু বৈষ্ণব ধর্মে মাতাপিতা অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিজেও সন্ন্যাস নেওয়ার পর তাঁর মা শচীদেবীর নির্দেশ মেনে চলেছিলেন। ইসকনের সাধুরা মূলত *'খাবার'** নয়, বরং খাবারের পেছনের 'উপাদান ও চেতনা' নিয়ে সতর্ক থাকেন।
তারা মায়ের হাতে খান না — বিষয়টি এমন নয়। তারা মূলত পেঁয়াজ-রসুন মিশ্রিত বা অনিবেদিত (আমিষের সংস্পর্শে আসা) খাবার খান না। যদি মা সাত্ত্বিক উপায়ে নিরামিষ রান্না করেন এবং তা ভগবানকে নিবেদন করা হয়, তবে তা গ্রহণ করতে তাদের কোনো বাধা নেই।


