ইসকন্ (ISKCON – International Society for Krishna Consciousness) সংগঠনটি শ্রীল প্রভুপাদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত, এবং এর ভিত্তি ভাগবত ধর্ম ও ভক্তিযোগ। ভক্তদের জীবন শুদ্ধ ও কৃষ্ণ-চেতনায় স্থিত রাখার জন্য ইসকন চারটি প্রধান নিয়ম (চারটি বিধিনিষেধ) মানার উপর গুরুত্ব দেয়। এই চারটি নিয়ম মূলত শাস্ত্রীয় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং ভক্তির পথে অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত।
নিচে এই চারটি বিধিনিষেধ ও তাদের শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
✅ ১. নিরামিষ আহার — মাংস, মাছ, ডিম না খাওয়া
শাস্ত্রীয় ভিত্তি:
ভগবদ্গীতা ৯.২৬:
> পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং, যো মে ভক্ত্যা প্রয়চ্ছতি।
তদহং ভক্ত্যুপহৃতম্ অশ্নামি প্রয়তাত্মনঃ॥
অর্থ: যে ভক্তিপূর্বক আমাকে পত্র (পাতা), পুষ্প (ফুল), ফল বা জল প্রদান করে, আমি তা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করি।
মনুস্মৃতি ৫.৪৫-৪৬:
> অহিংসা পরমো ধর্মঃ – অহিংসাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম। প্রাণীহিংসা থেকে বিরত থাকা এবং শুধু কৃষ্ণকে উৎসর্গযোগ্য পবিত্র আহার গ্রহণ করার আদর্শ থেকেই এই নিয়মটি এসেছে।
✅ ২. অবৈধ যৌন সম্পর্ক পরিহার (শুধু গার্হস্থ্য জীবনে সন্তান উৎপত্তির জন্য বৈধ যৌনতা অনুমোদিত)
শাস্ত্রীয় ভিত্তি:
ভগবদ্গীতা ৭.১১:> ধর্মাবিরুদ্ধো ভূতেষু কামোऽস্মি ভরতর্ষভ।
অর্থ: হে ভরতবংশীয়, আমি সেই কাম যা ধর্মসম্মত – অবৈধ কামনাকে আমি সমর্থন করি না।
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১১.৫.১১:> লাস্য গানাদি লোলূপতা... — যিনি সংযমী নন, তিনি ভক্তিযোগে অগ্রসর হতে পারেন না।
বৈষ্ণব দর্শনে ইন্দ্রিয়-সংযম গুরুত্বপূর্ণ, আর অবৈধ যৌনতা ইন্দ্রিয় ভোগের চূড়ান্ত প্রকাশ।
✅ ৩. মদ্যপান, নেশা দ্রব্য, ধূমপান ও মাদকদ্রব্য গ্রহণ না করা
শাস্ত্রীয় ভিত্তি:
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১.১৭.৩৮:> পানম ধূমং নারীসঙ্গং... এভং ধর্ম চারিণঃ।
অর্থ: মদ্যপান, ধূমপান, নারীসঙ্গ (অবৈধ যৌনতা), পশুহত্যা – এইসব ধর্মের পরিপন্থী কাজ।
চাণক্য নীতি:> মদঃ শ্রীয়ম্ হরতি বুদ্ধিম্ নাশয়তি — মদ্যপান সম্পদ ও বুদ্ধি ধ্বংস করে।
নেশা ইন্দ্রিয় ও মনকে বিভ্রান্ত করে, যা ভক্তির পথে বড় বাধা।
✅ ৪. জুয়া ও ভাগ্য নির্ভর খেলা পরিহার (যেমন তাস, লটারি, বেটিং ইত্যাদি)
শাস্ত্রীয় ভিত্তি:
মনুস্মৃতি ৭.৫০:> দ্যূতং চাকর্ষণং চৈব রাজনাম্ রাজারিপুম্ স্মৃতম্।
জুয়া রাজ্যের ও সমাজের ধ্বংস ডেকে আনে।
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১.১৭.৩৮ আবার এই চারটি পাপের কথা একত্রে উল্লেখ করেছে – জুয়া তার একটি।
জুয়া লোভ ও অসততা বৃদ্ধি করে, যা ভক্তির পথে সর্বনাশের কারণ।
উপসংহার:ইসকনের এই ৪টি নিয়ম শাস্ত্রসম্মত, এবং এগুলো মূলত ইন্দ্রিয় সংযম, শুচিতা ও ভক্তিপূর্ণ জীবনের জন্য অপরিহার্য। এগুলো পালন করলে ভক্ত হৃদয় থেকে আসক্তি দূর হয়ে ভগবদ্চেতনায় দৃঢ়তা আসে।


