কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ঠিক মুখোপাত্রে অর্জুন নিজের রথ দুইপক্ষের সৈন্যদলের মাঝখানে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগেই তিনি ধনুক-বাণ নামিয়ে দিয়ে যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানান। মহাভারতের 'শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা' অংশে এর প্রধান কারণগুলো বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে:
১. স্বজনপ্রীতি ও গভীর মোহ
অর্জুন যখন বিপরীত পক্ষে তাকালেন, তখন তিনি দেখলেন সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর নিজের পরম শ্রদ্ধেয় পিতামহ ভীষ্ম, গুরু দ্রোণাচার্য, ভাইপো, মামা, এবং ছোটবেলার বন্ধুবান্ধবরা। তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে ধরে হত্যা করার কথা ভেবে তিনি গভীর মোহ ও মানসিক দ্বন্দ্বে পড়ে যান।
২. স্বজন হত্যার পাপবোধ ও অপরাধবোধ
অর্জুনের মনে হয়েছিল, রাজ্য বা ভোগের আশায় নিজের কুল, আত্মীয়-স্বজন ও গুরুজনদের হত্যা করা ঘোর পাপ। তিনি ভাবেন, স্বজনদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া কোনো জয় বা রাজ্য তাকে সুখ দিতে পারবে না।
৩. বংশ ও সমাজের ধ্বংসের আশঙ্কা
অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বলেন, এই মহাভারতে যদি বীরদের হত্যা করা হয়, তবে পরিবার ও সমাজ ভেঙে পড়বে। কুলক্ষয় হলে পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংস্কার নষ্ট হবে, যা সমাজে চরম অরাজকতা ও নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে আসবে।
৪. অহিংসা ও করুণা
যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতির কথা চিন্তা করে অর্জুনের হৃদয় গভীর করুণা ও বিষাদে ভরে যায় (যা শাস্ত্রে 'অর্জুন-বিষাদযোগ' নামে পরিচিত)। তিনি মনে করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেয়ে নিজে নিঃশ্বস্ত্র অবস্থায় মারা যাওয়া কিংবা ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করাও শ্রেয়।
অর্জুনের এই চরম মানসিক বিভ্রান্তি, সংশয় ও বিষাদ দূর করার জন্যই শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে আত্মজ্ঞান, কর্মযোগ এবং ক্ষত্রিয় হিসেবে তাঁর ধর্মের শিক্ষা দেন, যা ইতিহাসে 'শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা' নামে অমর হয়ে রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণের সেই উপদেশ পাওয়ার পরই অর্জুন পুনরায় ধনুক তুলে নেন এবং যুদ্ধ করতে সম্মত হন।


