মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে আত্মীয়-স্বজন ও গুরুজনদের বিপক্ষে যুদ্ধ করতে দেখে অর্জুন তীব্র বিষাদ ও মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি যুদ্ধ করতে অস্বীকার করলে শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে যে উপদেশ দেন, তা-ই 'শ্রীমদ্ভগবদ্বগীতা' নামে পরিচিত।
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধ করতে বলার পেছনে কয়েকটি মূল ও গভীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক কারণ ছিল:
১. অধর্মের বিনাশ ও ধর্ম সংস্থাপন
কৌরবরা একের পর এক অন্যায়, চক্রান্ত ও অধর্মের আশ্রয় নিয়েছিল (যেমন: দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, পাণ্ডবদের প্রতারণা করে বনবাসে পাঠানো ইত্যাদি)। শান্তিদূত হিসেবে শ্রীকৃষ্ণের সমস্ত শান্তির প্রস্তাব কৌরব রাজসভা প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফলে সমাজের নিরাপত্তা ও বিচার প্রতিষ্ঠা করতে অধর্মের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়েছিল।
২. ক্ষত্রিয় হিসেবে অর্জুনের 'স্বধর্ম' পালন
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে মনে করিয়ে দেন যে, অর্জুন একজন ক্ষত্রিয়। একজন যোদ্ধার পরম ধর্ম ও কর্তব্য হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং প্রজাদের রক্ষা করা। যুদ্ধের ময়দানে ব্যক্তিগত আবেগ, মমতা বা সম্পর্কের কারণে ধর্ম ও কর্তব্য থেকে পিছিয়ে আসা ক্ষত্রিয়োচিত আচরণ নয়।
৩. কর্মযোগ ও নিষ্কাম কর্মের শিক্ষা
অর্জুন যুদ্ধের পরিণতি (আত্মীয়দের মৃত্যু, পাপের ভয়) নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে নিষ্কাম কর্মের উপদেশ দেন:
"কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন"
(অর্থাৎ, কর্মে তোমার অধিকার আছে, কিন্তু তার ফলে নয়।)
শ্রীকৃষ্ণ বলেন, অর্জুনের কাজ ফল বা ফলাফলের চিন্তা না করে ন্যায়বিচারের জন্য নিজের কর্তব্য করে যাওয়া।
৪. আত্মার অমরতা ও পরম সত্য
অর্জুন যাতে স্বজন হারানোর শোকে ভেঙে না পড়েন, সেজন্য শ্রীকৃষ্ণ আধ্যাত্মিক তত্ত্ব বোঝান। তিনি বলেন, শরীর নশ্বর হলেও আত্মা অবিনশ্বর—আত্মাকে কেউ বধ করতে পারে না, আত্মার মৃত্যুও হয় না। তাই সত্য ও ধর্মের লড়াইয়ে কারোর শারীরিক মৃত্যু হলেও তা আত্মাকে ধ্বংস করতে পারে না।
৫. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, সমাজের শ্রেষ্ঠ বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যে আচরণ করেন, সাধারণ মানুষ তাঁকেই অনুসরণ করে। অর্জুন যদি নিজের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যান, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও অন্যায়ের সামনে কাপুরুষতা দেখাবে এবং সমাজ শৃঙ্খলাহীন হয়ে পড়বে।
সংক্ষেপে, শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কোনো ব্যক্তিগত হিংসা বা রাজ্য জয়ের লোভে যুদ্ধ করতে বলেননি; বরং পাপ ও অন্যায়ের হাত থেকে সমাজকে রক্ষা করতে, ন্যায়বিচার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে এবং নিজের পরম কর্তব্য পালন করতে যুদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।


