কৃষ্ণভক্তির পথে প্রধান অন্তরায় বা বাধাগুলোকে বৈষ্ণব দর্শনে বিশেষ গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হয়েছে। শ্রীরূপ গোস্বামী তাঁর 'ভক্তিরসামৃতসিন্ধু' গ্রন্থে ভক্তির পথের অন্তরায় হিসেবে কয়েকটি মূল বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন।
প্রধান অন্তরায়গুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. আসক্তি ও জাগতিক বিষয় (বিষয়াসক্তি)
সংসারের রূপ, রস, গন্ধ ও শব্দের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি কৃষ্ণভক্তির পথে বড় বাধা। যখন মন জাগতিক ভোগ-বিলাসে মগ্ন থাকে, তখন ভগবানের চরণে পূর্ণ একাগ্রতা আসা কঠিন হয়ে পড়ে।
২. অভক্তি ও অপরাধ
ভক্তিপথে সাধকের উন্নতির পথে সবচেয়ে বড় পাথর হলো 'অপরাধ'। এর মধ্যে প্রধান হলো:
নাম অপরাধ: ভগবানের পবিত্র নাম জপ করার সময় করা অপরাধ।
বৈষ্ণব অপরাধ: কোনো ভক্ত বা সাধু ব্যক্তির নিন্দা বা অপমান করা (এটি সবচেয়ে মারাত্মক অন্তরায়)।
সেবা অপরাধ: ভগবানের পূজা বা সেবার সময় নিয়ম-কানুন অবজ্ঞা করা।
৩. অত্যাহার ও প্রয়াস (অত্যধিক আহার ও সঞ্চয়)
অত্যাহার: প্রয়োজনের তুলনায় বেশি আহার করা বা নিজের ভোগবৃদ্ধির জন্য সম্পদ জমা করা।
প্রয়াস: ভক্তির প্রতিকূল জাগতিক কাজে অতিরিক্ত শক্তি ও সময় ব্যয় করা।
৪. প্রজল্প (অপ্রয়োজনীয় কথা)
বৃথা সময় নষ্ট করে গ্রাম্য কথা বা অন্যের নিন্দা-চর্চা করা ভক্তির রস কমিয়ে দেয়। কৃষ্ণকথা ব্যতীত অন্য কোনো জল্পনা ভক্তি হৃদয়ে থিতু হতে দেয় না।
৫. সঙ্গদোষ
অসাধু সঙ্গ বা যারা ভক্তিবিমুখ তাদের সাথে মেলামেশা করলে মনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। ভক্তি বৃদ্ধির জন্য যেমন সাধুসঙ্গ প্রয়োজন, তেমনি ভক্তি রক্ষার জন্য কুসঙ্গ বর্জন করাও আবশ্যক।
৬. লোক-মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা (প্রতিষ্ঠাশা)
নিজের নাম, যশ বা সম্মানের আকাঙ্ক্ষা করা। ভক্তি হলো বিনম্র মনের ব্যাপার; যখন মনে অহংকার বা লোকদেখানো ভাবের উদয় হয়, তখন শুদ্ধা ভক্তি দূরে সরে যায়।
৭. নিয়মাগ্রহ ও নিয়মাগ্রহ (ভুল নিয়ম পালন)
শাস্ত্রের উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে কেবল অন্ধভাবে নিয়ম পালন করা।
আবার ভক্তির অনুকূল নিয়মগুলোকে অবজ্ঞা বা অলসতাবশত বর্জন করা।
সংক্ষেপে: ভক্তিকে যদি একটি চারাগাছের সাথে তুলনা করা হয়, তবে এই অন্তরায়গুলো হলো আগাছার মতো। আগাছা পরিষ্কার না করলে যেমন চারাগাছ বাড়তে পারে না, তেমনি এই দোষগুলো দূর না করলে কৃষ্ণভক্তি পূর্ণতা পায় না।


