পূজার পরে মূর্তিকে কেনো নদীতে ডুবিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়?
1 answers
34 views
ঋষভ
Eva Dhali
Uzzwal Dhali
+3
Answer
Login

আরও পড়ুন ...

1 Answer

পূজার শেষে মূর্তিকে নদীতে বা জলাশয়ে বিসর্জন দেওয়ার পেছনে রয়েছে গভীর ধর্মীয় তাৎপর্য, আধ্যাত্মিক দর্শন ও সাংস্কৃতিক রীতি। নিচে এর কারণগুলো বিশ্লেষণ করছি:


🔱 ১. ভগবানের আগমন ও প্রত্যাবর্তনের প্রতীকঃ

🔸 যখন আমরা পূজার সময় মূর্তির মাধ্যমে ভগবানের আহ্বান করি —

তখন সেই মূর্তিকে "প্রাণপ্রতিষ্ঠা" করা হয়। অর্থাৎ, সেই মূর্তিতে ভগবানের চেতনা বা শক্তির আবাহন করা হয়।

🔸 পূজা শেষে, "উত্তরপূজা" ও "বিসর্জন" হয় —
এতে আমরা ভগবানকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন:

“হে ভগবান, আপনি আমাদের হৃদয়, গৃহ ও সমাজে আগমন করেছিলেন। এখন আপনি আপনার গৌরবময় ধামে ফিরে যান।”

🔹 এই বিসর্জন মানে — ভগবান আবার তাঁর আধ্যাত্মিক জগতে ফিরে গেলেন।


🌊 ২. পঞ্চভূতে বিলীন হওয়া (তত্ত্ব)

মূর্তি তৈরি হয় পঞ্চতত্ত্ব দিয়ে — মাটি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ।
বিসর্জন মানে:

“যেখান থেকে আসা, সেখানে ফেরত যাওয়া।”
🔹 এটি সনাতন দর্শনের একটি মূল তত্ত্ব।

এই দেহও যেমন মৃত্যুর পরে পঞ্চভূতে বিলীন হয়,
তেমনই ভগবানের প্রতীকী মূর্তিও পূজার শেষে জলে (প্রকৃতিতে) বিলীন হয়।


🧘 ৩. আসক্তি হ্রাসের শিক্ষাঃ

🔸 পূজার সময়ে আমরা মূর্তিকে সাজাই, পূজা করি, ভালোবাসি।
কিন্তু বিসর্জনের সময় আমরা তাকে ছেড়ে দিই।

👉 এই রীতি আমাদের শেখায়—
ভগবানের প্রতি ভালোবাসা স্থায়ী হলেও, বস্তুজগতে কিছুই স্থায়ী নয়।
আমাদের চিত্ত যেন কেবল বাহ্য রূপে না, ভগবানের চেতনায় আবদ্ধ থাকে।


🌎 ৪. পরিবর্তনশীল জগতের প্রতীকঃ

🔸 মূর্তি জলে ভাসানো মানে জগতের পরিবর্তনশীলতা ও অনিত্যতার প্রতীক।
যে রূপ দেখে আমরা মুগ্ধ হই, সেটিও একসময় অদৃশ্য হয়ে যায়।

এটি গীতার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ —
“অশ্বত্থম্ এইমং লোকম্" — জগত একটি উল্টো অশ্বত্থ বৃক্ষ, যার শিকড় উপরে।


🪔 ৫. বিনয়ের প্রকাশঃ

বিসর্জন মানে —

“হে ভগবান, আপনি এসেছিলেন, আমাদের কৃপা করেছিলেন।
এখন আপনি যান, কিন্তু আপনার আশীর্বাদ আমাদের হৃদয়ে রয়ে যাক।”

🔹 এটি একধরনের বিনয় ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।


🏞️ ৬. প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা (প্রাচীন প্রথা)

🔸 প্রাচীনকালে মূর্তি ছিল প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি (মাটি, গরুর গোবর, পাতা)
তাই তা পরিবেশবান্ধবভাবে জলে মিশে যেত।

বর্তমানে যদিও অনেক মূর্তি প্লাস্টার বা রঙে তৈরি হয়, তাই এখন অনেক জায়গায় পরিবেশবান্ধব বিসর্জনের জন্য কৃত্রিম জলাধার ব্যবহার করা হয়।


✅ উপসংহারঃ

বিসর্জন একটি আধ্যাত্মিক শিক্ষাঃ

  • ভগবানের আগমন ও প্রত্যাবর্তন স্মরণ

  • পঞ্চভূতের জ্ঞান ও বৈরাগ্যের বোধ

  • অসার বস্তুজগত থেকে ঈশ্বর-স্মরণে স্থিত হওয়া

🔔 এই কারণে বিসর্জন কেবল একটি সামাজিক রীতি নয়,
বরং ভক্তির পরিণত রূপ, দর্শনের এক অনুশীলন।