সনাতন ধর্মশাস্ত্রে (বিশেষ করে প্রাচীন চিকিৎসা ও তাত্ত্বিক গ্রন্থ যেমন চরক সংহিতা, শ্রুতসংহিতা এবং বিভিন্ন পুরাণে) সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ এবং হিজড়া (তৃতীয় লিঙ্গ বা 'ক্লীব') সন্তানের জন্ম হওয়ার কারণ আধ্যাত্মিক ও শারীরিক — উভয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
প্রধানত গর্ভাধানের সময় মা-বাবার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা এবং জীবের কর্মফল —
এই দুটি বিষয়কে শাস্ত্রের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে:
১. শারীরিক বা দৈহিক কারণ (সুশ্রুত ও চরক সংহিতা অনুযায়ী) প্রাচীন আয়ুর্বেদ ও শরীরতত্ত্ববিদ ঋষি সুশ্রুত ও চরক গর্ভাধানের মুহূর্তের শুক্র (পিতৃবীজ) ও শোণিত (মাতৃবীজ)-এর শক্তির ওপর ভিত্তি করে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের উৎপত্তির ব্যাখ্যা দিয়েছেন:
শুক্র ও শোণিতের সমতা: শাস্ত্রমতে, গর্ভাধানের সময়ে যদি পুরুষ-বীজ (শুক্র) বেশি শক্তিশালী হয়, তবে পুত্র সন্তান জন্মায়। আর যদি নারী-বীজ (শোণিত) বেশি শক্তিশালী হয়, তবে কন্যা সন্তান জন্মায়। কিন্তু যদি শুক্র ও শোণিত—এই দুই বীজই সমপরিমাণ বা সমান শক্তির হয়, তবে সন্তান পুরুষ বা নারী কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গ না পেয়ে 'ক্লীব' বা তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে জন্মগ্রহণ করে।
বীজের দুর্বলতা বা বৈকল্য: গর্ভাধানের সময়ে পিতা বা মাতার শারীরিক দুর্বলতা, শুক্রাণু বা ডিম্বাণুর কোনো ত্রুটি বা মানসিক অস্থিরতার কারণেও সন্তান তৃতীয় লিঙ্গ প্রাপ্ত হতে পারে।
২. আধ্যাত্মিক ও কর্মফলগত কারণ সনাতন দর্শন ও পুরাণ অনুযায়ী, জন্ম-মৃত্যু এবং মানুষের শারীরিক রূপ লাভ করার পেছনে 'কর্মফল' (Karma) সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে:
পূর্বজন্মের কর্ম: বৈষ্ণব ও অন্যান্য শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, জীব আত্মা তার পূর্বজন্মের অনিষ্পন্ন কর্ম বা বাসনা নিয়ে নতুন দেহ ধারণ করে। যদি কোনো জীব আত্মার প্রারব্ধ কর্ম এমন হয় যা পুরুষ বা স্ত্রী—কোনো এক একক দেহের মাধ্যমে পূর্ণ হওয়া সম্ভব নয়, তবে প্রকৃতি তাকে তৃতীয় লিঙ্গের দেহ প্রদান করে।
বাসনার প্রভাব: পূর্বজন্মে পুরুষ বা নারী দেহের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি, আবার একই সাথে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি তীব্র মানসিক রূপান্তরের বাসনাও পরবর্তী জন্মে এমন শারীরিক অবয়ব পাওয়ার কারণ হতে পারে বলে মনে করা হয়।
৩. শাস্ত্রীয় ও পৌরাণিক দৃষ্টিভঙ্গি শাস্ত্রে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গকে কোনো অভিশাপ বা অশুভ কিছু হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটি প্রকৃতিরই একটি স্বাভাবিক বৈচিত্র্য বা রূপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মহাভারতে বৃহন্নলা রূপী অর্জুনের কথা বা রামায়ণে শ্রীরামের প্রতি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অনন্য ভক্তির কথা পাওয়া যায়, যেখানে তাঁদের বিশেষ স্থান ও আশীর্বাদের উল্লেখ আছে।
শাস্ত্রের মতে, গর্ভাধানের সময়ে পিতা-মাতার শুক্র ও শোণিতের সাম্যাবস্থা (শারীরিক কারণ) এবং জীবাত্মার পূর্বজন্মের প্রারব্ধ কর্মফল (আধ্যাত্মিক কারণ) — এই দুইয়ের মিলনেই হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গ সন্তানের জন্ম হয়।


