মানুষের জীবন ও সমাজের ওপর ইসকন (ISKCON) - এর প্রভাব বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু বিষয় অত্যন্ত ইতিবাচক এবং আকর্ষণীয় বলে মনে হয় —
১. জ্ঞানের সুশৃঙ্খল পরিবেশনা
ইসকনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তারা বৈদিক জ্ঞানকে (বিশেষ করে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা) খুব সুশৃঙ্খল এবং আধুনিক মানুষের বোধগম্য করে উপস্থাপন করে। তাদের বইগুলোতে মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং তাৎপর্য যেভাবে দেওয়া থাকে, তা যে কেউ খুব সহজে বুঝতে পারে।
২. বর্ণ-বৈষম্যহীন বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব
ইসকন প্রমাণ করেছে যে আধ্যাত্মিকতা কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মন্দিরে গেলে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ—যাদের ভাষা ও সংস্কৃতি আলাদা—সবাই মিলে একই সুরে 'হরে কৃষ্ণ' মন্ত্র গাইছেন। এই একতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধ সত্যিই প্রশংসনীয়।
৩. জীবনযাত্রার শুদ্ধতা
তারা যেভাবে চারটি নিয়ম (নেশামুক্তি, নিরামিষ আহার, জুয়া বর্জন ও চরিত্র রক্ষা) পালনের মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল জীবন গঠন করতে শেখায়, তা আজকের অস্থির সমাজে অত্যন্ত জরুরি। অনেক মানুষ ইসকনের সংস্পর্শে এসে খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করে সুস্থ জীবন ফিরে পেয়েছেন।
৪. 'প্রসাদম' বা পবিত্র অন্ন বিতরণ
ইসকনের খাবার বা 'প্রসাদ' বিতরণের বিষয়টি অত্যন্ত মানবিক। তাদের 'ফুড ফর লাইফ' (Food for Life) কর্মসূচি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নিরামিষ খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা। এটি ক্ষুধার্ত মানুষের সেবা করার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক চেতনা জাগিয়ে তোলার একটি চমৎকার উপায়।
৫. শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চা
তাদের মন্দিরের স্থাপত্য, অসাধারণ কীর্তন এবং শাস্ত্রীয় নৃত্যের মাধ্যমে তারা যেভাবে সনাতন সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছে, তা শিল্পমনা যে কাউকেই মুগ্ধ করে।
৬. সেবার মানসিকতা
ইসকনের ভক্তদের মধ্যে বিনয় এবং সেবার (Servitude) যে মানসিকতা দেখা যায়, তা বর্তমানের আত্মকেন্দ্রিক পৃথিবীতে একটি বড় শিক্ষা হতে পারে। তারা নিজেদের 'দাসের দাস' মনে করে অহংকার বর্জনের যে শিক্ষা দেয়, তা মানুষের চারিত্রিক উন্নতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
সহজ কথায়, ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষের চরিত্র গঠন এবং মানসিক শান্তির জন্য তাদের এই পদ্ধতিগত প্রচেষ্টাগুলো আমার কাছে বেশ অর্থবহ মনে হয়।


