আসলে বিষয়টি "না মানা" নয়, বরং দেব-দেবীদের পদমর্যাদা বা অবস্থান নিয়ে তাদের একটি নির্দিষ্ট দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। ইসকন মূলত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা এবং শ্রীমদ্ভাগবতম-এর শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে চলে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করতে নিচের পয়েন্টগুলো দেখা যেতে পারে —
১. পরমেশ্বর বনাম দেব-দেবী
ইসকন বিশ্বাস করে যে, শ্রীকৃষ্ণ হলেন 'স্বয়ং ভগবান' বা পরমেশ্বর (Supreme Personality of Godhead)। অন্যদিকে, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, দুর্গা, গণেশ বা কার্তিকের মতো দেব-দেবীদের তারা 'গুণাবতার' বা ভগবানের অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিনিধি (Demigods) হিসেবে গণ্য করে।
সহজ কথায়: কৃষ্ণ হলেন সূর্যের মতো, আর অন্যান্য দেব-দেবীরা হলেন সূর্যের রশ্মির মতো। তারা কৃষ্ণের অংশ বা তাঁর শক্তির প্রকাশ।
২. সম্মান ও অবজ্ঞা
এটি একটি ভুল ধারণা যে ইসকন অন্য দেব-দেবীদের শ্রদ্ধা করে না। ইসকন অনুসারীরা প্রতিটি দেব-দেবীকে পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখেন কারণ তারা মনে করেন দেব-দেবীরা ভগবানের সেবায় নিয়োজিত।
যেমন: তারা শ্রীশিবকে ‘বৈষ্ণবানাং যথা শম্ভু’ (বৈষ্ণবদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ) হিসেবে সম্মান করে।
শ্রীরামচন্দ্রকে তারা কৃষ্ণেরই অবতার হিসেবে পূজা করে।
৩. উপাসনার ধরন (একনিষ্ঠ ভক্তি)
হিন্দুধর্মের অনেক সম্প্রদায় সব দেব-দেবীকে সমান স্তরে রেখে পূজা করে (পঞ্চোপাসনা)। কিন্তু ইসকন অনুসারীরা একনিষ্ঠ ভক্তি বা 'অনন্যা ভক্তি' অনুসরণ করে। তাদের যুক্তি হলো:
"যদি গাছের গোড়ায় জল দেওয়া হয়, তবে শাখা-প্রশাখা এমনিতেই পুষ্টি পায়।"
অর্থাৎ, তারা মনে করেন কৃষ্ণের পূজা করলে সব দেব-দেবীর পূজা আপনাআপনি সম্পন্ন হয়ে যায়, আলাদাভাবে পূজা করার প্রয়োজন পড়ে না।
৪. দেব-দেবীদের কাছে কী চাওয়া হয়?
সাধারণত মানুষ পার্থিব সুখ, ধন-সম্পদ বা রোগমুক্তির জন্য দেব-দেবীদের কাছে যায়। ইসকন শেখায় যে, এসব অস্থায়ী জিনিসের বদলে ভগবানের প্রতি শুদ্ধ ভক্তি চাওয়া উচিত। তারা মনে করেন, দেব-দেবীরাও কৃষ্ণের ভক্ত, তাই তাদের কাছে প্রার্থনা করা উচিত যেন তারা কৃষ্ণের চরণে ভক্তি পেতে সাহায্য করেন।
৫. শাস্ত্রীয় রেফারেন্স
তারা গীতার নবম অধ্যায়ের ২৩ নম্বর শ্লোকটি উল্লেখ করে, যেখানে বলা হয়েছে:
"যে অন্য দেব-দেবীর পূজা করে, তারা আসলে পরোক্ষভাবে কৃষ্ণেরই পূজা করে, কিন্তু তা বিধিপূর্বক নয়।"
ইসকন দেব-দেবীদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে না বা তাঁদের অবমাননা করে না। তারা কেবল কৃষ্ণকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে অন্য সবাইকে তাঁর সেবক বা প্রতিনিধি হিসেবে সম্মান জানায়। তাদের কাছে ভক্তি হলো একটি সরাসরি সংযোগ, যেখানে মাঝখানে অন্য কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন তারা মনে করে না।


