ব্রাহ্মন ও পুরোহিত কী সনাতন ধর্মের ধ্বংসের কারন ?
পুরোহিত ব্রাহ্মণরা চাইতো, জ্ঞান কেবল তাদের করায়ত্ত থাকুক, রাজা-মহারাজাদেরকে ভুলভাল ব্যাখা দিয়ে তারা রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের করায়ত্ত রাখতে চাইতো, যে বর্ণাশ্রম মানুষের মেধার উপর ভিত্তি করে হয়েছিল, তারা সেটাকে নিজেদের সুবিধার জন্য জন্মের ভিত্তিতে তৈরি করেছিলো।
বৈদিক যুগে যে পৈতা ছিল তা কেবল একটি সনদ (= পুরস্কার) মাত্র, ব্রাহ্মণরা যদি নিজেদের আচার-আচরণ থেকে ভ্রষ্ট হতো তাহলে সেই পৈতা প্রয়োজন বোধে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হতো, যেমন এখনকার যুগে প্রয়োজন বোধে পুরষ্কার বা সনদ বাতিল করা হয়।
যে বেদ পাঠে সকলেরই অধিকার ছিল, সে বেদপাঠ তারা কেবল নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করেছিলো। ব্রাহ্মণ উৎকৃষ্ট জীব এবং শুদ্র নিকৃষ্ট জীব এই প্রথা তারাই প্রচলন করেছিলো। যে আশ্রমে সকলে শিক্ষা লাভ করতে পারতো সে আশ্রম কে তারা কেবল নিজেদের শিক্ষার জন্যই বানিয়েছিল। আর তাদের এই স্বৈরাচার মূলক আচরণ এর পথে মূল বাঁধা ছিল বৌদ্ধ মঠ গুলি। তারা চাইতো তারা বাদ দিয়ে অন্যান্য সকলেই মূর্খ থাকুক। তাই হয়তো বা কৈবর্ত রাজাদের আক্রমণে সোমপুর বিহার বিধ্বস্ত হয়। যারা তাদের বানানো এই প্রথার বিরোধিতা করতো সেইসব রাজাদেরকে লোকদ্বারা উস্কানীমূলক ভাবে তারা শাস্তি দান করতো।
দেবদাসী, সেবাদাসী, সাধনসঙ্গিনী, নামে তারা নারীদের দাসী বানিয়ে রাখতো আবার সেই নারীকেই তারা মাতৃরূপে পুজা করতো, যে শাস্তি ধর্ষণের জন্য দেওয়া হতো, সেই শাস্তিকেই তারা ধর্মের রং চড়িয়ে, তান্ত্রিকদের অনুকরণ করে নরবলি, শিশু বলির মতো ঘৃণ্য ও জঘন্য প্রথায় পরিণত করেছিল।
সহগমন একটি ঐচ্ছিক বিষয়, সেটিকেই তারা সতীদাহ প্রথার মত জঘন্য প্রথায় পরিণত করেছিলো। মেয়ের বাবার দানকে তারা যৌতুক প্রথার মত জঘন্য প্রথায় পরিণত করেছিলো। যাগযজ্ঞ নিষিদ্ধ হবার পরপরই একদল পুরোহিত সনাতন সমাজ কে তাদের নিজস্ব ব্যাবসায়িক স্বার্থে দিকভ্রান্ত করে।
সর্বপ্রথম বর্ণপ্রথার বিলোপ করার চেষ্টা করেছিলেন আদি শংকর। কিন্তু তারা তার নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার অনেক চেষ্টাই করেছে। সে জন্যই অনেক বাঙালি হিন্দুই আজ জানে না আচার্য আদি শংকর এর নাম।
আচার্য চাণক্য পুরোহিত ব্রাহ্মণদের রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর জন্য রাজ্য চালনার একটি সুনির্দিষ্ট সংবিধান রচনা করেছিলেন। তিনি বলতেন রাজ্য না তো চলবে ব্রহ্মণের বিধানে না তো চলবে রাজার বচনে। জন্ম যাই হোক যথাতথা কর্ম হোক ভালো। তাই চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের মৃত্যুর পর বিন্দুসার কে উসকানি দিয়ে তাকে রাজ্যছাড়া করা হয়েছিল।
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছিলেন মানুষ সবাই সমান, সে জন্যই তাকে পুরীর পান্ডারা বরাদ্দ করেছিল কঠিন শাস্তি। শ্রী রামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ, রাজা রামমোহন রায় সহ সকল বর্ণবাদীদের বিরুদ্ধে তারা গড়ে তুলেছিলো বিশাল বিধিনিষেধ ও বাঁধার পাহাড়। আজও তাদের করা নিয়মের জন্যই ধনীরা আগে পুজো দিতে পারে আর গরীবেরা পরে। তাদের তৈরি যৌতুক প্রথার জন্যই হাজার হাজার নারী জ্বলন্ত পুড়ে মরে।
গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন যে তিনটি জিনিস কে কখনো লুকিয়ে রাখা রাখা যায় না, চন্দ্র সূর্য এবং সত্য। মিথ্যার মেঘ যতই ঘন হোক না কেন তা কোনদিনই সত্যের সূর্য কে লুকিয়ে রাখতে পারে না। আর সত্য তো এটাই যাই পুরোহিত প্রাধান্য এবং তাদের তৈরি জাত-পাত প্রথার কারণেই সনতান সমাজে আজ যত রাজ্যের গোড়ামী, কুসংষ্কার, অন্ধ বিশ্বাস এবং ভ্রান্ত ধারণার জন্ম হয়েছে। তা না হলে কর্ম প্রধান সনাতন ধর্ম কি করে ছত্রিশ জাতিতে বিভক্ত হলো। বৌদ্ধ ধর্ম যুক্তি প্রধান। তারা যুক্তি ছাড়া কিছুই মানতে চায় না। তাদের মূল লক্ষ্য জ্ঞান অন্বেষণ করতে হবে এবং সত্য কে জানতে হলে আগে নিজেকে জানতে হবে কারণ জ্ঞান ও সত্য সকলের জন্য উন্মুক্ত। তাই সত্য হলো এটাই যে মহাযানের থেকে বজ্রযানে গমন যেমন একটা রূপান্তর। তেমনি কর্মপ্রধান সনাতন ধর্ম পুরোহিত প্রধান হিন্দু ধর্মে পরিণত হওয়া তেমনি একটি রূপান্তর। আর পুরোহিত প্রাধান্যের কারণেই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ব্যপক বিধ্বংস, আর পুরোহিতদের বানানো জাতপাত প্রথার কারণেই অন্যধর্মে ধর্মান্তর।


