সনাতন ধর্মে সত্যকে কেবল একটি নৈতিক গুণ বা সাধারণ সততা হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটিকে মহাজাগতিক ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্বের মূল ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।
এই ধর্মে সত্যের গুরুত্ব এত বেশি হওয়ার প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. ঈশ্বর ও সত্য অভিন্ন
সনাতন ধর্মে পরমেশ্বর বা পরমব্রহ্মকে সত্যের সাথেই তুলনা করা হয়েছে। 'সত্য' শব্দের উৎপত্তি ' সৎ' থেকে, যার অর্থ 'যা সর্বদাই বিদ্যমান' এবং যা কখনো পরিবর্তিত হয় না। যেহেতু ঈশ্বর শাশ্বত ও অবিনাশী, তাই সনাতন দর্শনে "সত্যম শিবম সুন্দরম" (যা সত্য, তা-ই মঙ্গলময় এবং তা-ই সুন্দর) বলা হয়। অর্থাৎ সত্যকে জানাই ঈশ্বরকে জানার সমান।
২. ধর্ম ও জগতের মূল ভিত্তি
উপনিষদ ও মহাভারতে বলা হয়েছে, "সত্যেন ধার্যতে পৃথিবী"—অর্থাৎ সত্যের ওপরই পৃথিবী টিকে রয়েছে। সনাতন নীতিশাস্ত্রে 'ধর্ম' মানে কেবল নিয়মকানুন নয়, ধর্ম হলো মহাজাগতিক শৃঙ্খলা (ঋত)। আর সত্য হলো সেই শৃঙ্খলার মূল চাবিকাঠি। সত্য ত্যাগ করলে ধর্ম ও সামাজিক শৃঙ্খলা ধ্বংস হয়ে যায়।
৩. মুক্তির একমাত্র পথ (মোক্ষ)
মুণ্ডক উপনিষদের বিখ্যাত বাক্য হলো: "সত্যমেব জয়তে নানৃতং" (সত্যেরই জয় হয়, মিথ্যার নয়)। আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য এবং জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি বা 'মোক্ষ' লাভের জন্য সত্যনিষ্ঠ হওয়া বাধ্যতামূলক। অবিদ্যা বা মিথ্যার মোহ থেকে মুক্ত হয়ে সত্য উপলব্ধি করলেই আত্মার মুক্তি ঘটে।
৪. যোগ ও তপস্যার প্রধান অঙ্গ
মহর্ষি পতঞ্জলির 'যোগসূত্র'-এ বর্ণিত অষ্টাঙ্গ যোগের প্রথম ধাপ হলো 'যম' (আত্মসংযম), যার অন্যতম প্রধান উপাদান হলো 'সত্য' (চিন্তা, বাক্য ও কর্মে সৎ থাকা)। সত্য কথা বলা এবং সত্য জীবনযাপন করাকে সবচেয়ে বড় তপস্যা বা সাধনা বলে মনে করা হয়।
৫. চার যুগের সত্যের ধারণা
সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী, চার যুগের মধ্যে প্রথম যুগ হলো 'সত্য যুগ' (বা কৃত যুগ), যখন বিশ্বজুড়ে কেবল সত্য ও ধর্মের আধিপত্য ছিল। বলা হয়, যুগে যুগে মানুষের নৈতিক অবনতি হলেও সত্যের শক্তি অপরিবর্তিত থাকে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, সনাতন ধর্মে সত্য কোনো বাহ্যিক নিয়ম নয়, বরং এটি জীবনের চরম সত্য ও আত্মিক পরম রূপ। সত্যের পথ অনুসরণ করাই হলো প্রকৃত ধর্ম পালনের পথ।


