অনিচ্ছা সত্বেও জীব কেনো পাপকর্ম করে?
1 answers
14 views
Uzzwal Dhali
+1
Answer
Login

আরও পড়ুন ...

1 Answer

꧁◼️প্রশ্ন:৩ জীব অনিচ্ছা সত্বেও কেন পাপকর্ম করে? (৩/৩৬)◼️꧂

****শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – তৃতীয় অধ্যায় – কর্মযোগ*****

|অর্জুন উবাচ |

❝ অথ কেন প্রযুক্তঃ-অয়ম্ পাপম্ চরতি পূরুষঃ।
অনিচ্ছন্-অপি বার্ষ্ণেয় বলাৎ-ইব নিয়োজিতঃ॥ ❞

━┉┈┈(ভগবদ্গী‌তা, ৩/৩৬)

অনুবাদ: “অর্জুন বললেন━হে বার্ষ্ণেয়! মানুষ কার দ্বারা চালিত হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেন বলপূর্বক নিয়োজিত হয়েই পাপাচরণে প্রবৃত্ত হয়?”

|শ্রীভগবানুবাচ|

❝ কাম এষ ক্রোধ এষ রজোগুণ-সমুদ্ভবঃ।
মহাশনো মহাপাপ্মা বিদ্ধি-এনম্‌-ইহ বৈরিণম্ ॥ ৩৭ ॥ ❞

অনুবাদ: “পরমেশ্বর ভগবান বললেন━ হে অর্জুন, রজোগুণ থেকে সমুদ্ভূত কামই (কামনাই) মানুকে এই পাপে প্রবৃত্ত করে এবং এই কামই ক্রোধে পরিণত হয়। কাম সর্বগ্রাসী (অর্থাৎ ভোগের দ্বারা কখনো তৃপ্ত হয় না) ও পাপাত্মক; কামকেই জীবের প্রধান শত্রু বলে জানবে।”

❝ ধূমেন-আব্রিয়তে বহ্নিঃ-যথা-আদর্শঃ মলেন চ।
যথা-উল্বেন-আবৃতঃ গর্ভস্তথা তেন-ইদম্-আবৃতম্॥ ৩৮ ॥ ❞

অনুবাদ: “অগ্নি যেমন ধূম (ধোঁয়া) দ্বারা আবৃত্ত থাকে, দর্পণ যেমন ময়লার দ্বারা আবৃত্ত থাকে অথবা গর্ভ যেমন জরায়ুর দ্বারা আবৃত থাকে, তেমনই কামের দ্বারা জ্ঞান অর্থাৎ বিবেক আবৃত থাকে।”

অর্থাৎ, জীবের পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় (চক্ষু,কর্ন,নাসিকা,জিহ্বা এবং ত্বক) ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় (হস্ত, পদ, বাক্‌ বা কথা, পায়ু বা মলদ্বার, উপস্থ বা যোনিদ্বার) , সংকল্প-বিকল্পাত্মক মন (বাসনা ও সংশয় যুক্ত মন) এবং অনিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি (অল্পবুদ্ধি) হল কামের আশ্রয়। এদের দ্বারা বিবেকজ্ঞান আবৃত হলে কাম দেহাভিমানী জীবকে ভ্রান্ত করে।

বিবেক প্রকটিত হয় বুদ্ধিতে। বুদ্ধি তিন প্রকারের সাত্ত্বিক, রাজসিক,তামসিক। সাত্ত্বিক বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তির কর্তব্য-অকর্তব্য সম্বন্ধে স্পষ্ট জ্ঞান থাকে। কিন্তু রাজসিক ও তামসিক বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তির গীতা জ্ঞান বা ধর্ম পথে মতি থাকে না, অজ্ঞ হয়, কৃষ্ণ ভজনা করে না তাই এমন ব্যক্তির কামনার দ্বারা বিবেক অন্ধকার হয়ে থাকে।

তাই বিষয়-বাসনা যুক্ত বিবেকে কখনই আত্মজ্ঞানের উদয় হয় না। অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন বা বিবেকবর্জিত লোকেরা জাগতিক ভোগ ও ঐশ্বর্যে আসক্ত থাকার কারণে তাদের বুদ্ধি বা ভক্তি একনিষ্ঠ হয় না। যেমন ধূম (ধোঁয়া) অপসারিত হলে অগ্নি প্রকাশিত হয়, ধূলিরাশি অপসারিত হলে দর্পণের স্বচ্ছতা প্রতিভাত হয়, প্রসবের দ্বারা জরায়ূ প্রসারিত হলে ভ্রুণের প্রকাশ হয়, সেইরূপ বিষয়-বাসনা বিদূরিত হলে তত্ত্বজ্ঞানের উদয় হয়। তত্ত্বজ্ঞানের উদয় হলে ভগবানকে জানার ইচ্ছা প্রকাশ হয়, জানার ইচ্ছা থেকে ভগবানকে লাভ করার ইচ্ছা প্রকাশ হয়। তখন ভগবানের কৃপায় বিবেকে জাগ্রত হয় নিশ্চয়াত্মিকা ভক্তি বা একনিষ্ঠ ভক্তি বা নিশ্চল ভক্তি। 

❝ আবৃতং জ্ঞানম্-এতেন জ্ঞানিনো নিত্যবৈরিণা ।
কামরূপেণ কৌন্তেয় দুষ্পূরেণ-অনলেন-চ॥ ৩৯ ॥ ❞

অনুবাদ: “কামরূপী চির শত্রুর দ্বারা জীবের শুদ্ধ চেতনা আবৃত হয়। এই কাম দুর্বারিত অগ্নির মতো চিরঅতৃপ্ত।”

❝ ইন্দ্রিয়াণি মনো বুদ্ধিঃ-অস্য-অধিষ্ঠানম্-উচ্যতে।
এতৈঃ-বিমোহয়তি-এষঃ জ্ঞানম্-আবৃত্য দেহিনম্॥ ৪০ ॥ ❞

অনুবাদ: “ইন্দ্রিয়সমূহ, মন ও বুদ্ধি এই কামের আশ্রয়স্থল। এই ইন্দ্রিয় আদির দ্বারা কাম জীবের প্রকৃত জ্ঞানকে আচ্ছন্ন করে তাকে বিভ্রান্ত করে।”

❝ তস্মাৎ-ত্বম্-ইন্দ্রিয়াণি-আদৌ নিয়ম্য ভরতর্ষভ।
পাপ্মানং প্রজহি হি-এনম্ জ্ঞানবিজ্ঞাননাশনম্॥ ৪১ ॥ ❞

অনুবাদ: “অতএব, হে ভরতশ্রেষ্ঠ! তুমি প্রথমে ইন্দ্রিয়গুলিকে নিয়ন্ত্রিত করে জ্ঞান ও বিজ্ঞান-নাশক পাপের প্রতীকরূপ এই কামকে বিনাশ কর।”

❝ ইন্দ্রিয়াণি পরাণি-আহুঃ-ইন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মনঃ।
মনসস্তু পরা বুদ্ধির্যো বুদ্ধেঃ পরতস্তু সঃ॥ ৪২ ॥ ❞

অনুবাদ: “আমাদের স্থুলদেহ (শরীর) থেকে ইন্দ্রিয়গুলি শ্রেষ্ঠ (বা বলশালী) , ইন্দ্রিয়গুলি থেকে মন শ্রেষ্ঠ (বা বলশালী), মন থেকে বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ (বা বলশালী), বুদ্ধি হইতে যিনি শ্রেষ্ঠ তিনিই আত্মা। সেই হলে তুমি। হে অর্জুন! সেইজন‍্য তুমি ইন্দ্রিয়সমূহ, মন এবং বুদ্ধি নিরুদ্ধ করতে সক্ষম।”

❝ এবং বুদ্ধেঃ পরং বুদ্ধা সংস্তভ্য-আত্মানম্-আত্মনা।
জহি শত্রুং মহাবাহো কামরূপং দুরাসদম্॥ ৪৩ ॥ ❞

অনুবাদ: “হে মহাবীর অর্জুন! নিজেকে জড় ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধির অতীত জেনে, নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধির (ঈশ্বরের প্রতি অটুট ভক্তিতে সাহায্যকারী বুদ্ধি) দ্বারা মনকে স্থির কর এবং এভাবেই চিৎ-শক্তির (ভগবান থেকে প্রাপ্ত চিন্ময় শক্তি) দ্বারা কামরূপ দুর্জয় শত্রুকে জয় কর।”