উপনিষদ (বিশেষ করে কঠোপনিষদ) - এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কালজয়ী ধারণা হলো 'প্রেয়' (Preyas) এবং 'শ্রেয়' (Shreyas)। মানুষের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে এই দুটি পথ আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়।
নিচে এদের সহজ পরিচয় এবং জীবনের জন্য কোনটি শ্রেষ্ঠ, তা আলোচনা করা হলো —
১. প্রেয় (Preyas) কী?
'প্রেয়' হলো যা আপাতরমণীয়, অর্থাৎ যা সাময়িকভাবে দেখতে ও অনুভব করতে খুব সুন্দর, লোভনীয় এবং সুখদায়ক।
বৈশিষ্ট্য: এটি তাৎক্ষণিক ইন্দ্রিয়সুখ, আরাম, ভোগবিলাস এবং জাগতিক লাভ এনে দেয়।
উদাহরণ: সকালে ঘুম থেকে না উঠে অলসতা করা, অস্বাস্থ্যকর কিন্তু সুস্বাদু খাবার খাওয়া, বা সাময়িক লাভের জন্য মিথ্যা বলা।
পরিণতি: প্রেয়'র পথ শুরুতে মধুর হলেও এর শেষ পরিণতি সাধারণত দুঃখ, হতাশা বা পতন ডেকে আনে।
২. শ্রেয় (Shreyas) কী?
'শ্রেয়' হলো যা কল্যাণকর, অর্থাৎ যা মানুষের আত্মার জন্য, চরিত্রের জন্য এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃত মঙ্গল বয়ে আনে।
বৈশিষ্ট্য: এটি অর্জনের পথটা প্রায়শই কঠিন, ত্যাগ তিতিক্ষা ও শৃঙ্খলার দাবি করে। এটি তাৎক্ষণিক আনন্দ না দিয়ে মনের শান্তি ও আত্মিক উন্নতি দেয়।
উদাহরণ: কঠোর পরিশ্রম করা, শরীর সুস্থ রাখতে নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন, নৈতিকতা ধরে রাখা এবং আধ্যাত্মিক সাধনা।
পরিণতি: শ্রেয়-র পথ শুরুতে কষ্টের বা তেতো মনে হলেও এর শেষ পরিণতি পরম শান্তি, স্থায়িত্ব এবং অমৃতময় হয়।
জীবনে কোনটি লাভ করা শ্রেষ্ঠ?
শাস্ত্র, দর্শন এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা — সব দিক থেকেই 'শ্রেয়' লাভ করাই পরম শ্রেষ্ঠ।
কঠোপনিষদে ঋষি পরিষ্কারভাবে বলেছেন —
মানুষের কাছে শ্রেয় এবং প্রেয় — উভয় পথই আসে। বুদ্ধিমান ব্যক্তি এই দুটিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এদের মধ্যকার পার্থক্য বোঝেন। তিনি প্রেয়-কে ত্যাগ করে শ্রেয়-র পথ বেছে নেন। আর যিনি মন্দ বা অল্পবুদ্ধি, তিনি কেবল বাহ্যিক সুখের লোভে প্রেয়-র পথ আঁকড়ে ধরেন এবং শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যভ্রষ্ট হন।
শ্রেয় শ্রেষ্ঠ হওয়ার মূল কারণগুলো —
স্থায়ী বনাম ক্ষণস্থায়ী: প্রেয় থেকে পাওয়া সুখ বুদবুদের মতো ক্ষণস্থায়ী। ভোগ শেষ হলেই তা শেষ। অন্যদিকে, শ্রেয় মানুষের জীবনে যে শান্তি ও তৃপ্তি আনে, তা চিরস্থায়ী।
ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের গঠন: প্রেয় মানুষকে ইন্দ্রিয়ের দাসে পরিণত করে, যা মনের শক্তি কমিয়ে দেয়। শ্রেয় মানুষকে আত্মসংযমী, শক্তিশালী এবং প্রকৃত অর্থে স্বাধীন করে তোলে।
আধ্যাত্মিক ও পরম লক্ষ্য: আপনি যদি জাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন, তবে শ্রেয় আপনাকে সমাজে একজন সম্মানিত ও সফল মানুষ বানাবে। আর আধ্যাত্মিক (যেমন পূর্বের আলোচনায় বৈষ্ণব দর্শনের) দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ক্ষণস্থায়ী জাগতিক সুখ (প্রেয়) ত্যাগ করে ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি ও প্রেম লাভ করাই মানুষের জীবনের একমাত্র পরম 'শ্রেয়'।
প্রেয় হলো যা আমাদের মন ও ইন্দ্রিয় চায়, আর শ্রেয় হলো যা আমাদের আত্মার জন্য প্রকৃত কল্যাণকর। তাই ক্ষণস্থায়ী মোহের পেছনে না ছুটে দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণ তথা 'শ্রেয়' লাভ করাই মানুষের জীবনের আসল সার্থকতা।


