শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা এবং বৈদিক দর্শন অনুযায়ী, মানুষের বর্তমান জীবনের সুখ-দুঃখের পেছনে প্রাক্তন বা পূর্বজন্মের কর্মফলের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে বিষয়টি কেবল ভাগ্যের লিখন নয়, বরং এর পেছনে গভীর কার্যকারণ সম্পর্ক বিদ্যমান।
এই দর্শনটিকে প্রধানত তিনটি দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায়:
১. কর্মের গতি ও প্রারব্ধ কর্ম
গীতায় বলা হয়েছে যে, কর্মের গতি অত্যন্ত গহন। আমরা অতীতে যা করেছি, তার ফল বর্তমান জীবনে ভোগ করি। একে বলা হয় 'প্রারব্ধ কর্ম'। যেমন একটি তীর ধনু থেকে বেরিয়ে গেলে তা আর ফেরানো যায় না, তেমনি পূর্বজন্মের কিছু সুনির্দিষ্ট কর্মের ফল এই জন্মে আমাদের সুখ বা দুঃখ হিসেবে ভোগ করতে হয়।
২. কারণ ও ফলাফল (Law of Cause and Effect)
সনাতন ধর্ম অনুযায়ী, মহাবিশ্বের কোনো কিছুই আকস্মিক নয়। বর্তমান জীবনের কোনো বিশেষ পরিস্থিতি, জন্মগত সুবিধা বা অসুবিধা এবং মানসিক প্রবণতাকে পূর্বজন্মের সঞ্চিত কর্মের (সঞ্চিত কর্ম) বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হয়।
"মানুষ যেমন পুরনো পোশাক ত্যাগ করে নতুন পোশাক পরিধান করে, তেমনি আত্মাও পুরনো দেহ ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করে।" (অধ্যায় ২, শ্লোক ২২)
এই ধারাবাহিকতায় আত্মা তার পূর্ববর্তী সংস্কার বা কর্মের রেশ সঙ্গে নিয়ে আসে।
৩. বর্তমানের পুরুষার্থ বা স্বাধীন ইচ্ছা (Free Will)
এখানেই গীতার দর্শনের একটি বিশেষ মোড় রয়েছে। যদিও পূর্বজন্মের কর্মফল আমাদের বর্তমান পরিস্থিতি নির্ধারণ করে, কিন্তু বর্তমান কর্মের মাধ্যমে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করতে পারি।
পূর্বজন্মের ফল হলো 'ভাগ্য'।
বর্তমান জীবনের প্রচেষ্টা হলো 'পুরুষার্থ'।
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কর্ম করার জন্য উৎসাহিত করেছেন কারণ মানুষের হাত-পা বাধা নেই। আমরা যদি বর্তমানে সৎ পথে চলি এবং 'নিষ্কাম কর্ম' করি, তবে তা কেবল বর্তমানের দুঃখ লাঘব করে না, বরং আগামীর জন্য একটি উন্নত জীবনের পথ তৈরি করে।
৪. সুখ-দুঃখের ঊর্ধ্বে ওঠা
গীতা আমাদের শেখায় যে সুখ এবং দুঃখ হলো ঋতু পরিবর্তনের মতো ক্ষণস্থায়ী।
"মাত্রাস্পর্শাস্তু কৌন্তেয় শীতোষ্ণসুখদুঃখদাঃ..." (অধ্যায় ২, শ্লোক ১৪) অর্থাৎ, ইন্দ্রিয় থেকে উৎপন্ন এই সুখ-দুঃখ আসা-যাওয়া করবেই। তাই এগুলোকে পূর্বজন্মের শাস্তি বা পুরস্কার হিসেবে না দেখে, অবিচলিত থেকে নিজের কর্তব্য পালন করা উচিত।
সহজ কথায়: হ্যাঁ, দর্শনের মতে বর্তমানের অনেক সুখ-দুঃখই পূর্বজন্মের রোপণ করা বীজের ফল। তবে আমরা সেই ফলের প্রতি কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাব এবং বর্তমানকে কীভাবে কাজে লাগাব, সেই স্বাধীনতা আমাদের সবসময় থাকে। দুঃখকে পূর্বজন্মের শাস্তি মনে করে ভেঙে না পড়ে, তাকে ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সাথে মোকাবিলা করাই গীতার আসল শিক্ষা।


