সনাতন প্রথা অনুযায়ী দেবী দুর্গার প্রতিমা গড়ার সময় ১০টি স্থান থেকে মাটি সংগ্রহ করতে হয়, যাকে শাস্ত্রে ‘পুণ্যমাটি’ বলা হয়। এর মধ্যে নদীগর্ভ, গোশালা, শ্মশান, রাজবাড়ির মাটির পাশাপাশি অন্যতম একটি অপরিহার্য উপাদান হলো পতিতালয়ের মাটি (বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা)।
শাস্ত্রীয় ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর পেছনে কয়েকটি গভীর ও বৈপ্লবিক কারণ রয়েছে —
১. পতিতালয়ের মাটিকে ‘পুণ্যমাটি’ মনে করার মূল কারণ
শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যখন অন্যায় বা কামনার বশে পতিতালয়ে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাঁর জীবনের অর্জিত সমস্ত পুণ্য, পবিত্রতা ও নৈতিকতা দরজাতেই ফেলে রেখে ভেতরে প্রবেশ করেন।
ফলে সমাজের দৃষ্টিতে স্থানটি অপবিত্র হলেও, পতিতালয়ের দরজার মাটিটি ওই ব্যক্তির পুণ্য ও পবিত্রতায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। এই দার্শনিক বিশ্বাস থেকেই সেই মাটিকে ‘পবিত্র’ বা ‘পুণ্যমাটি’ হিসেবে গণ্য করে দেবীর মূর্তি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
২. সর্বজনীনতা ও দেবী মহামায়ার মাতৃত্ব
দেবী দুর্গা হলেন জগতজননী বা সর্বজনীন মা। মায়ের কাছে তাঁর সন্তান ধার্মিক নাকি পাপী, সাধু নাকি পতিত—তাতে কোনো ভেদাভেদ থাকে না।
সমাজে যারা অবহেলিত, বঞ্চিত এবং সামাজিকভাবে অস্বীকৃত, দেবী তাদেরকেও নিজের পূজায় সমান অধিকার ও মর্যাদা দিয়েছেন।
পতিতালয়ের মাটি ছাড়া দেবীর প্রতিমা অপূর্ণ থাকার অর্থ হলো—মহামায়ার মাতৃরূপের কাছে সমাজের তথাকথিত ‘পাপী’ বা ‘পূত’ সবার স্থান সমান।
৩. নারীর সম্মান ও সামাজিক বার্তা
প্রাচীন ঋষি ও সমাজ সংস্কারকরা এই প্রথার মাধ্যমে সমাজে একটি বড় বার্তা দিতে চেয়েছেন। যে নারীদের সমাজ ‘পতিতা’ বলে ঘৃণা করে বা দূরে ঠেলে দেয়, বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেবীর আরাধনার উদ্দেশ্যে তাঁদের দরজায় নত হতে হয়।
এটি সমাজকে মনে করিয়ে দেয় যে, নারীরা পরিস্থিতির শিকার হতে পারেন, কিন্তু তাঁরাও দেবীশক্তিরই অংশ। সমাজে তাঁদের অস্তিত্ব ও অবদানকে অস্বীকার করে কোনো মহাশক্তির পূজা পূর্ণ হতে পারে না।
৪. দশ মৃত্তিকার (১০টি স্থান) অংশ
দুর্গাপূজার বিধানে দেবীমূর্তির জন্য যে ‘দশমৃত্তিকা’ প্রয়োজন হয়, সেগুলো হলো —
১. নদীগর্ভের মাটি
২. গোশালের মাটি
৩. গজশালার (হাতির স্থান) মাটি
৪. অশ্বশালার (ঘোড়ার স্থান) মাটি
৫. রাজদ্বারের মাটি
৬. চতুস্পাঠীর (বিদ্যাস্থান) মাটি
৭. দুই নদীর সংগমস্থলের মাটি
৮. সমুদ্রতীরের মাটি
৯. শ্মশানের মাটি
১০. পতিতালয়ের মাটি
পতিতালয়ের মাটি ব্যবহারের প্রথাটি কেবল কোনো ধর্মীয় আচার নয়; এটি সনাতন দর্শনের এক উদার, সর্বজনীন এবং নারীজাতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক। এটি প্রমাণ করে যে মহামায়া দুর্গার পূজায় সমাজের কোনো অংশই অস্পৃশ্য নয়।


