অভিমন্যু ছিলেন শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ ও মহাবীর অর্জুন এবং শ্রীকৃষ্ণের বোন সুভদ্রার পুত্র। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের ভাগ্নে, ফলে ছোটবেলা থেকেই তিনি দ্বারকায় মামা শ্রীকৃষ্ণ এবং বলরামের তত্ত্বাবধানে বড় হয়ে ওঠেন।
অর্জুনের পুত্র হওয়ার কারণে তাঁর রক্তেই ধনুুর্বিদ্যা ছিল, যার ওপর ভিত্তি করে তিনি অল্প বয়সেই একজন মহাপরাক্রমশালী ‘অতিরথী’ যোদ্ধা হয়ে ওঠেন। অর্থাৎ যিনি একা হাজার হাজার যোদ্ধার সাথে লড়াই করতে পারেন।
মৎস্যদেশের রাজা বিরাটের কন্যা উত্তরার সাথে অভিমন্যুর বিবাহ হয়। তাঁদের পুত্রই ছিলেন পরবর্তীকালের বিখ্যাত রাজা পরীক্ষিত।
অভিমন্যু যখন তাঁর মা সুভদ্রার গর্ভে ছিলেন, তখন একদিন অর্জুন সুভদ্রাকে যুদ্ধের অজেয় রণকৌশল 'চক্রব্যূহ' - এ প্রবেশের নিয়ম বোঝাচ্ছিলেন। গর্ভেই থাকা অবস্থাতেই শিশু অভিমন্যু ব্যূহে প্রবেশ করার কৌশলটি পুরো শিখে নেন।
কিন্তু অর্জুন যখন ব্যূহ থেকে বেরিয়ে আসার নিয়মটি বোঝাতে যাবেন, ঠিক তখনই সুভদ্রা ঘুমিয়ে পড়েন। ফলে অর্জুন আর বাকি কৌশলটি বলেননি। এর ফলে অভিমন্যু ব্যূহে প্রবেশের পদ্ধতি জানলেও বের হওয়ার কৌশলটি আর শিখতে পারেননি।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ১৩তম দিনে কৌরব সেনাপতি দ্রোণাচার্য পাণ্ডবদের পরাস্ত করার জন্য একটি 'চক্রব্যূহ' রচনা করেন। পাণ্ডবপক্ষে কেবল অর্জুন এবং শ্রীকৃষ্ণই এই ব্যূহ ভেদ করতে পারতেন, কিন্তু কৌরবরা কৌশলে অর্জুনকে যুদ্ধের অন্য প্রান্তে সরিয়ে নিয়ে যায়। তাই তখন পাণ্ডবদের রক্ষা করতে ১৬ বছর বয়সী কিশোর অভিমন্যু একা সেই অজেয় চক্রব্যূহে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন।
অভিমন্যু একাই কৌরবদের ব্যূহ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং কৌরব পক্ষের শত শত মহারথীকে ছত্রভঙ্গ করে দেন। পরিকল্পনা ছিল অন্য চার পাণ্ডব (যুধিষ্ঠির, ভীম, নকুল, সহদেব) অভিমন্যুর পেছনে পেছনে ভেতরে ঢুকবেন। কিন্তু শিবের বরপ্রাপ্ত সিন্ধুপথ জয়দ্রথ একা চার পাণ্ডবকে ব্যূহের মুখে আটকে দেন। ফলে অভিমন্যু ভেতরে একা আটকা পড়ে যান।
শাস্ত্রীয় যুদ্ধের নিয়ম ভেঙে কৌরবদের সাতজন প্রবীণ মহারথী দ্রোণাচার্য, কর্ণ, কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা, দুর্মুখ, দুঃশাসনপুত্র এবং শকুনি একসাথে তরুণ অভিমন্যুকে ঘিরে ধরেন। কর্ণের বাণে তাঁর ধনুক ভেঙে ফেলা হয়, রথ ও সারথীকে ধ্বংস করা হয়। সব অস্ত্র হারানোর পরও অভিমন্যু রথের চাকা হাতে নিয়ে বীরের মতো যুদ্ধ চালিয়ে যান। অবশেষে দুঃশাসনের পুত্রের আঘাতে এই বীর বালক রণক্ষেত্রে বীরগতি লাভ করেন।
অভিমন্যুর এই নির্মম হত্যা মহাভারতের যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এটি ছিল যুদ্ধের নিয়মের (ধর্মযুদ্ধের) প্রথম বড় লঙ্ঘন। পুত্রশোকে উন্মত্ত অর্জুন পরদিনই সূর্য ডোবার আগে জয়দ্রথকে বধ করার প্রতিজ্ঞা নেন এবং তা পূরণ করেন। অভিমন্যুর মৃত্যুর পরেই যুদ্ধ তার সমস্ত নিয়ম-নীতি হারিয়ে একটি চরম ধ্বংসাত্মক রূপ নেয় এবং সবশেষে এই ধর্মযুদ্ধে পাণ্ডবদের জয় হয়।


