SushantaVerified
July 6, 2026
শ্রী শ্রী জগন্নাথদেব যদি পরমেশ্বর ভগবান হন তাহলে স্নানযাত্রার পর কেন জ্বর হবে?
1 answers
51 views
Uzzwal Dhali
Puja
Asish Biswas
+5
Answer
Login

আরও পড়ুন ...

1 Answer

শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত এবং বৈদান্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীজগন্নাথদেবের এই জ্বর হওয়া বা 'অনবসর' লীলার একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা রয়েছে। শাস্ত্রে ভগবানকে 'লীলাময়' এবং 'ভক্তবৎসল' বলা হয়েছে।

নিচে শাস্ত্রীয় ও তত্ত্বগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এর মূল কারণগুলো আলোচনা করা হলো:

১. ভগবানের চিদানন্দময় দেহ এবং অপ্রাকৃত লীলা

বেদান্ত এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন (যেমন শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত) অনুযায়ী, ভগবানের শরীর আমাদের মতো পঞ্চভৌতিক (মাটি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ) নয়। তাঁর দেহ হলো 'সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ' (সৎ-চিৎ-আনন্দ)।

  • শাস্ত্রীয় মতে, পরমেশ্বরের কোনো জড় রোগ বা প্রাকৃত জ্বর হতে পারে না।

  • শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (৪.৯) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন:

    "জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ..." অর্থাৎ, ভগবানের জন্ম, কর্ম এবং লীলা সবই দিব্য বা অপ্রাকৃত। তাই স্নানযাত্রার পরের এই জ্বর কোনো শারীরিক অসুস্থতা নয়, এটি ভগবানের একটি অপ্রাকৃত অনুকরণ বা লীলামাত্র

২. শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর তত্ত্ব ও 'বিরহ ভাব' আস্বাদন

শাস্ত্রীয় ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ১৫ দিনের অনবসর কালটি ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে 'বিরহ রস' (Separation in Love) আস্বাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • স্নানযাত্রার পর যখন জগন্নাথদেব জনসমক্ষ থেকে অন্তরালে চলে যান, তখন ভক্তদের হৃদয়ে তীব্র বিরহ বেদনার সৃষ্টি হয়।

  • শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু স্বয়ং জগন্নাথদেবের এই বিরহ সহ্য করতে না পেরে পুরী থেকে আলালনাথে (ব্রহ্মগিরি) চলে যেতেন এবং সেখানে চতুর্ভুজ নারায়ণ রূপে জগন্নাথকে দর্শন করে অশ্রুবিসর্জন করতেন। শাস্ত্র মতে, মিলন অপেক্ষা বিরহে ভগবানের প্রতি ভক্তি ও প্রেম বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ভক্তের সেই প্রেমকে ঘনীভূত করতেই ভগবানের এই অন্তর্ধানের লীলা।

৩. অর্চ্চা-বিগ্রহের শাস্ত্রীয় নিয়ম ও সংস্কার (ঐতিহাসিক ও তান্ত্রিক মত)

শাস্ত্রীয় বিধি বা 'আগম শাস্ত্র' অনুযায়ী, জগন্নাথদেব হলেন 'অর্চ্চা-বিগ্রহ'। দারুব্রহ্ম (নিম কাঠ) দিয়ে তৈরি এই বিগ্রহের স্থায়িত্ব এবং আধ্যাত্মিক শক্তি অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য স্নানযাত্রার পর এই ১৫ দিন অত্যন্ত জরুরি।

  • বিগ্রহের অঙ্গরাগ: ১০৮ কলস জলে স্নান করার পর বিগ্রহের গায়ের প্রাকৃতিক রঙ কিছুটা ম্লান হয়। এই ১৫ দিন দৈতাপতি সেবকেরা অত্যন্ত গোপনে ভেষজ উপাদান, জড়িবুটি এবং প্রাকৃতিক রঙ দিয়ে বিগ্রহের পুনর্নির্মাণ বা 'অঙ্গরাগ' করেন।

  • গুপ্ত উপাসনা: শাস্ত্রমতে এটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সংস্কার প্রক্রিয়া, যা সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে করার নিয়ম। তাই শাস্ত্রীয় পরিভাষায় একে 'জ্বর' বা 'বিশ্রাম' হিসেবে অভিহিত করে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখা হয়।

৪. ভক্তের বাৎসল্য ও দাস্য রসের চরম সার্থকতা

শাস্ত্র অনুযায়ী, ভগবান শুধু পূজারী নন, তিনি ভক্তের পরম আত্মীয়। ভক্ত যাতে ভগবানকে নিজের সন্তান বা প্রভু ভেবে সেবা করতে পারেন, সেজন্যই তিনি এই লীলা করেন।

  • শাস্ত্রে উল্লেখ আছে, এই ১৫ দিন জগন্নাথদেবকে কোনো রাজকীয় অন্নভোগ দেওয়া হয় না। কেবল কবিরাজী পাচন, ফলমূল এবং ছানা দেওয়া হয়।

  • ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যেমন যশোদা মায়ের কাছে সাধারণ বালকের মতো আচরণ করতেন, ঠিক তেমনি জগন্নাথদেবও এখানে ভক্তের দেওয়া পথ্য গ্রহণ করে ভক্তের 'বাৎসল্য ভাব' এবং 'সেবা অধিকার' পূর্ণ করেন।

সংক্ষেপে শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত: ভগবান সর্বশক্তিমান এবং রোগ-ব্যাধির অতীত। কিন্তু শাস্ত্রীয় বিধি রক্ষা, বিগ্রহের অপ্রাকৃত সংস্কার এবং ভক্তের হৃদয়ে বিরহ ও সেবার আকুলতা বাড়িয়ে তোলার জন্যই পরমেশ্বর শ্রীজগন্নাথদেব স্নানযাত্রার পর এই 'জ্বর'-এর লীলাবিলাস করেন।

Uzzwal Dhali
Dip Kar
+2