শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা কেবল কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং এটি মানবজীবনের জন্য একটি বাস্তবমুখী ও কালজয়ী জীবন-দর্শন। মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পটভূমিতে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন, তা মূলত মানবজীবনের সংশয়, বিষাদ, সিদ্ধান্তহীনতা ও কর্মপদ্ধতির চিরন্তন প্রশ্নের সমাধান দেয়।
কুরুক্ষেত্রের রথে সারথি শ্রীকৃষ্ণ যেভাবে অর্জুনের মোহ দূর করেছিলেন, তা মানুষের বাস্তব জীবনে নিচের শিক্ষাগুলো প্রদান করে:
নিষ্কাম কর্মযোগ (ফলের আশা না করে কাজ করা): গীতার অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো— কাজ করাই মানুষের অধিকার, কিন্তু কাজের ফলাফলের ওপর তার কোনো একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলের চিন্তা করে কাজ করলে ভয় ও দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। তাই স্বকীয় দায়িত্ব হিসেবে আত্মনিয়োগ করে কর্ম করা উচিত, ফলাফল ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দেওয়া ভালো।
কর্মবিমুখতা নয়, দায়িত্ব পালন: গীতায় সংসার ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া বা কর্মত্যাগ করাকে সমর্থন করা হয়নি। অর্জুন যুদ্ধ থেকে পালাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে নিজের কর্তব্য ও ধর্ম পালন করতে বলেছেন। জীবনে পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, নিজের ন্যায়সঙ্গত দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকতে হবে।
সমত্বভাব ও মানসিক ভারসাম্য (স্থিতপ্রজ্ঞ): সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, জয়-পরাজয় ও মান-াপমানে বিচলিত না হয়ে মনকে শান্ত রাখার শিক্ষা দেয় গীতা। এই মানসিক ভারসাম্য বা সমত্বভাব অর্জন করতে পারলে জীবনের যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও স্থির থাকা সম্ভব হয়।
আত্মজ্ঞান ও অমরতা: গীতা অনুযায়ী, মানুষ কেবল নশ্বর দেহ নয়, মানুষ হলো অবিনশ্বর আত্মা। বস্ত্র পুরনো হলে মানুষ যেমন তা ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, আত্মাও তেমনি জীর্ণ দেহ ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করে। এই সত্য উপলব্ধি করলে মৃত্যুভয় ও প্রিয়জন হারানোর শোক কেটে যায়।
ইন্দ্রিয় সংযোম ও মন নিয়ন্ত্রণ: বিষয়ের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি থেকে কাম, কাম থেকে ক্রোধ, এবং ক্রোধ থেকে মানুষের বুদ্ধিনাশ ঘটে। তাই চোখ, কান, মনকে নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে— কারণ অনিয়ন্ত্রিত মন মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু, আর নিয়ন্ত্রিত মন সবচেয়ে বড় বন্ধু।
ভক্তি ও পরম সত্তায় আত্মসমর্পণ: ভক্তিযোগের মাধ্যমে গীতা শিক্ষা দেয় যে সর্বশক্তিমান পরমেশ্বরের ওপর বিশ্বাস রেখে সমস্ত কর্ম তাঁকে উৎসর্গ করলে মানুষ মানসিক শান্তি পায় এবং জীবনের চূড়ান্ত মুক্তি লাভ করে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা মানুষকে শেখায়— কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, কীভাবে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হয় এবং কীভাবে আসক্তিহীন হয়ে কর্মের মাধ্যমে আত্মোন্নতি লাভ করা যায়।


