শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা অনুযায়ী মানুষের প্রকৃত ধর্ম কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়, আনুষ্ঠানিক আচার-অনুষ্ঠান বা বাহ্যিক পরিচিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গীতার দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত ধর্ম হলো 'সনাতন ধর্ম' বা 'স্বধর্ম', যা মানুষের আত্মার চিরন্তন স্বভাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
গীতা অনুযায়ী মানুষের এই প্রকৃত ধর্মকে কয়েকটি প্রধান ধারণার মাধ্যমে বোঝা যায়:
১. আত্মার সনাতন ধর্ম (ভগবৎ-সেবা ও ভক্তি)
গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, মানুষ দেহ নয়, আত্মা। দেহের পরিবর্তন হলেও আত্মার কোনো পরিবর্তন হয় না। আত্মার মূল স্বভাব বা চিরন্তন ধর্ম হলো পরমাত্মা বা ভগবানের সাথে যুক্ত থাকা এবং তাঁর সেবা করা (অধ্যায় ১২, ভক্তিযোগ)। পরমেশ্বরের প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেম ও আত্মসমর্পণই আত্মার সর্বোচ্চ ধর্ম।
২. স্বধর্ম পালন (নিজের কর্তব্য সম্পাদন)
গীতা মানুষকে সমাজ ও জীবনের নিজ নিজ অবস্থা অনুযায়ী অর্পিত কর্তব্য পালনের নির্দেশ দেয়।
অনাসক্ত কর্ম: ফলাফলের আশা না করে কেবল কর্তব্যবোধ থেকে কাজ করাই হলো কর্মযোগ (অধ্যায় ৩, শ্লোক ৮)।
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন: “শ্রেয়ান্ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ”—অর্থাৎ, ভালোভাবে অনুষ্ঠিত পরধর্মের চেয়ে গুণহীন স্বধর্ম পালন করাও শ্রেয় (অধ্যায় ৩, শ্লোক ৩৫)।
৩. নিষ্কাম কর্ম ও ঈশ্বরার্পণ
নিজের সব কর্মের ফল ভগবানের চরণে উৎসর্গ করে কর্ম করাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম। যখন মানুষ অহংকার ত্যাগ করে ঈশ্বরকে কেন্দ্র করে কাজ করে, তখন তার কর্মই পূজায় রূপান্তরিত হয়।
৪. শরণাগতি বা চরম ধর্ম
গীতার একেবারে শেষভাগে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের পরম ও চূড়ান্ত ধর্মের কথা ঘোষণা করেছেন:
“সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ॥” (১৮/৬৬)
(অর্থ: সমস্ত জাগতিক ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বা ধারণার আসক্তি ত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব, শোক কোরো না।)
সংক্ষেপে, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা অনুযায়ী মানুষের প্রকৃত ধর্ম হলো—অহংকার ও ফলাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে সৎভাবে নিজের অর্পিত কর্তব্য পালন করা এবং ভক্তিভরে পরমেশ্বরের শরণাগত হওয়া।


