হিন্দু কালগণনা ও পৌরাণিক ঐতিহ্য অনুযায়ী, কলিযুগ হলো মহাজাগতিক চার-যুগ চক্রের (সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি) চতুর্থ এবং শেষ যুগ। এটি অধর্ম, পাপ, মানসিক অশান্তি ও নৈতিক অবনতির যুগ হিসেবে পরিচিত।
‘কলি’ শব্দের অর্থ সংঘাত, কলহ, অজ্ঞতা বা অজ্ঞানের অন্ধকার। সনাতন ধর্ম মতে, দ্বাপর যুগের শেষে এবং শ্রীকৃষ্ণের মর্ত্যধাম ত্যাগের মধ্য দিয়ে এই যুগের সূচনা হয়েছিল।
১. চার চরণের ধর্ম ও কলিযুগ
পৌরাণিক রূপকে ‘ধর্ম’-কে একটি ষাঁড় হিসেবে কল্পনা করা হয়, যার চারটি পা থাকে: সত্য (সত্যবাদিতা), দয়া, পবিত্রতা এবং দান।
সত্যযুগে ধর্মের ৪টি পাই পূর্ণ ছিল।
ত্রেতাযুগে ৩টি পা অবশিষ্ট ছিল।
দ্বাপরযুগে ২টি পা ছিল।
কলিযুগে ধর্মের মাত্র ১টি পা (সত্য বা দান) অবশিষ্ট থাকে, যার ফলে সমাজে ধর্ম ও নীতিবোধ সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় পৌঁছায়।
২. কলিযুগের প্রধান লক্ষণসমূহ (শাস্ত্রমতে)
শ্রীমদ্ভাগবত ও বিভিন্ন পুরাণে কলিযুগের মানবসমাজ ও প্রকৃতির যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তার মূল দিকগুলো হলো:
নৈতিক অবনতি: সত্যবাদিতা, দয়া ও সরলতা কমে গিয়ে মিথ্যা, কপটতা, অহংকার ও হিংসা বৃদ্ধি পায়।
সম্পদ ও ক্ষমতার প্রাধান্য: বিদ্যা, বংশ বা সৎ গুণের চেয়ে ধন-সম্পদই মানুষের সম্মান ও বিচার পাওয়ার প্রধান মাপকাঠি হয়ে ওঠে।
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রদর্শন: প্রকৃত আধ্যাত্মিকতার চেয়ে বাহ্যিক লোকদেখান আনুষ্ঠানিকতা বেশি দেখা যায়।
শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন: মানুষের আয়ু, শারীরিক বল, মেধা ও স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়। রোগ-ব্যাধি ও মানসিক মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়।
পরিবেশ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়: খরা, বন্যা, মহামারী এবং আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে।
৩. কলিযুগের ইতিবাচক দিক (ভক্তি ও সহজ পথ)
যদিও শাস্ত্রে কলিযুগকে পাপ ও কলহের যুগ বলা হয়েছে, তবুও একে একটি দিক থেকে অনন্য ও সহজ বলা হয়েছে:
হরিনাম বা নামসংকীর্তন: সত্যযুগে ধ্যান, ত্রেতাযুগে যজ্ঞ এবং দ্বাপরযুগে কঠিন পূজার মাধ্যমে যে পরম গতি লাভ হতো, কলিযুগে কেবল ভগবানের নাম জপ/সংকীর্তন (ভক্তি মার্গ) করেই পরম কল্যাণ বা মুক্তি লাভ করা সম্ভব।
চিন্তার পাপ মুক্ত: শাস্ত্রমতে, কলিযুগে মনে মনে পাপ চিন্তা করলে তার কোনো পাপের ফল ভোগ করতে হয় না; কিন্তু কোনো ভালো কাজের চিন্তা মনে করলেও তার পূর্ণ ফল পাওয়া যায়।
কলিযুগের শেষ ও নতুন সূচনা
পুরাণ অনুসারে, কলিযুগের মেয়াদ ৪,৩২,০০০ বছর (যার মধ্যে মাত্র প্রায় ৫,০০০ বছর পার হয়েছে)। কলিযুগের চরম সীমানায় যখন অধর্ম চরমে পৌঁছাবে, তখন ভগবান বিষ্ণু ‘কল্কি’ অবতারে আবির্ভূত হয়ে অধর্মের বিনাশ ঘটাবেন এবং পুনরায় ‘সত্যযুগ’-এর সূচনা করবেন।


