হিন্দু তথা সনাতন ধর্ম কি নাস্তিকতা সমর্থন করে?
1 answers
92 views
Uzzwal Dhali
Dip Kar
+2
Answer
Login

আরও পড়ুন ...

1 Answer

হ্যাঁ, সনাতন ধর্ম বা হিন্দুধর্মের কাঠামো এতটাই বিশাল যে এটি নাস্তিক্যবাদ বা ঈশ্বর-অস্বীকৃতিকেও একটি বৈধ দার্শনিক পথ হিসেবে গ্রহণ করার অবকাশ দেয়। সনাতন ঐতিহ্যে 'আস্তিক' ও 'নাস্তিক' শব্দের সংজ্ঞা প্রচলিত পশ্চিমা সংজ্ঞার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। এখানে যারা বেদের প্রামাণ্যতা স্বীকার করে তারা 'আস্তিক', আর যারা করে না তারা 'নাস্তিক'।

নিচে এর প্রধান দিকগুলো আলোচনা করা হলো —

১. ষড়দর্শন ও নাস্তিক্যভাব

সনাতন ধর্মের ছয়টি প্রধান দার্শনিক শাখা বা 'ষড়দর্শন' রয়েছে। এর মধ্যে কিছু দর্শন সরাসরি 'সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর' ছাড়াই জগতকে ব্যাখ্যা করে:

সাংখ্য দর্শন: এটি অত্যন্ত প্রাচীন একটি দর্শন। আদি সাংখ্য মতে মহাবিশ্ব 'প্রকৃতি' (পদার্থ/শক্তি) ও 'পুরুষ' (চেতনা)-এর সংযোগে সৃষ্টি হয়েছে। এখানে আলাদা কোনো ঈশ্বর বা মহাজাগতিক বিচারকের প্রয়োজন পড়েনি।

মীমাংসা দর্শন: এই দর্শনে যাগ-যজ্ঞ এবং 'কর্মফল'-এর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অনেক মীমাংসক মনে করতেন, কর্মই ফল দান করে, এর জন্য ঈশ্বরের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।


২. চার্বাক দর্শন (পুরোপুরি নাস্তিক্যবাদ)

প্রাচীন ভারতে চার্বাক বা লোকায়ত দর্শন ছিল সম্পূর্ণ নাস্তিক্যবাদী এবং জড়বাদী। তারা পুনর্জন্ম, আত্মা বা পরলোকে বিশ্বাস করত না। তাদের মতে, যা ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা যায় না, তার অস্তিত্ব নেই। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, চার্বাক দর্শনকেও প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রীয় আলোচনার একটি অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।


৩. আধ্যাত্মিক নাস্তিক্যবাদ ও উপনিষদ

উপনিষদে বলা হয়েছে— "তত্ত্বমসি" (তুমিই সেই) বা "অহং ব্রহ্মাস্মি" (আমিই ব্রহ্ম)। এর একটি গভীর অর্থ হলো, ঈশ্বর বাইরের কোনো আলাদা সত্তা নন, বরং প্রতিটি জীবের ভেতরেই সেই পরম চেতনা বিদ্যমান। এই চিন্তাটি অনেক সময় প্রথাগত মূর্তিপূজা বা সাকার ঈশ্বরে বিশ্বাস না করা ব্যক্তিদেরও ধর্মের মূল স্রোতে জায়গা দেয়।


৪. কর্মবাদ ও নৈতিকতা

সনাতন ধর্মে 'কর্ম' অত্যন্ত শক্তিশালী একটি ধারণা। অনেক দার্শনিক মনে করেন, যদি কেউ ঈশ্বরে বিশ্বাস না-ও করে কিন্তু নিজের 'স্বধর্ম' (কর্তব্য) নিষ্ঠার সাথে পালন করে এবং নীতিবান থাকে, তবে সে আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভ করতে পারে। অর্থাৎ, বিশ্বাসের চেয়ে আচরণের ওপর এখানে গুরুত্ব বেশি দেওয়া হয়েছে।


৫. বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের অবস্থান

যদিও বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মকে 'নাস্তিক' (বেদে অবিশ্বাসী) বলা হয়, কিন্তু এই দুটি ধারা ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঈশ্বরকে কেন্দ্র না করেও কীভাবে নৈতিকতা ও ধ্যানের মাধ্যমে নির্বাণ বা মোক্ষ লাভ করা যায়, তা এই ধর্মগুলো দেখিয়েছে।

সনাতন ধর্ম অনুযায়ী, সত্য অনুসন্ধানের পথ একটি নয়, বহু। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে:

"একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি" (সত্য এক, জ্ঞানীরা তাকে বহু নামে ডাকেন)।

তাই কেউ যদি মূর্তিপূজা বা ঈশ্বর তত্ত্বে বিশ্বাস না করে কেবল সত্য, বিবেক এবং মানবতার পথ অনুসরণ করে, তবে সনাতন ঐতিহ্য তাকে বর্জন করে না। এখানে জিজ্ঞাসু হওয়া বা প্রশ্ন করার স্বাধীনতা অত্যন্ত প্রবল, যা নাস্তিক্যবাদকেও এই বিশাল সংস্কৃতির একটি বৌদ্ধিক অংশ করে তুলেছে।

Uzzwal Dhali
+1