গান্ধারীর শত পুত্রের (কৌরবদের) মৃত্যুর পেছনে কেবল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নয়, বরং এর গভীরে কিছু আধ্যাত্মিক কারণ এবং অভিশাপ কাজ করেছিল। প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো —
১. গান্ধারীর পূর্বজন্মের কর্মফল
একটি প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, পূর্বজন্মে গান্ধারী একবার একটি কচ্ছপের আণ্ডা (ডিম) ভেঙে ফেলেছিলেন। সেই কচ্ছপটির একশটি সন্তান জন্ম নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু গান্ধারীর অসাবধানতায় তারা সবাই নষ্ট হয়ে যায়। সেই কচ্ছপের মা গান্ধারীকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, পরবর্তী জন্মে গান্ধারীকেও একইভাবে তাঁর একশটি সন্তানের মৃত্যু দেখতে হবে।
২. ঋষি মৈত্রেয়-র অভিশাপ
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে ঋষি মৈত্রেয় হস্তিনাপুরে এসে দুর্যোধনকে পাণ্ডবদের সঙ্গে সন্ধি করার উপদেশ দেন। কিন্তু অহংকারী দুর্যোধন সেই উপদেশে কর্ণপাত না করে নিজের উরুতে চাপড় মেরে ঋষিকে উপহাস করেন। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে ঋষি মৈত্রেয় অভিশাপ দেন যে, তাঁর এই অহংকারের কারণেই কৌরব বংশ ধ্বংস হবে এবং ভীমের গদার আঘাতে দুর্যোধনের উরু চূর্ণ হবে।
৩. শকুনির প্রতিহিংসা
গান্ধারীর ভাই শকুনির কৌরবদের প্রতি গভীর ঘৃণা ছিল। জনশ্রুতি আছে যে, ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারীর পরিবারকে (শকুনি ও তাঁর পিতা-ভ্রাতাদের) বন্দি করে অনাহারে রেখেছিলেন। মৃত্যুর আগে শকুনির পিতা তাঁকে বলেছিলেন কৌরব বংশ ধ্বংস করার জন্য। শকুনি তাঁর বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে কৌরবদের ক্রমাগত অধর্মের পথে পরিচালিত করেন, যা শেষ পর্যন্ত তাদের বিনাশের কারণ হয়।
৪. অধর্মের পথ অবলম্বন
সবচেয়ে বড় কারণ ছিল অধর্ম। কৌরবরা দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ থেকে শুরু করে পাণ্ডবদের বারবার হত্যার চেষ্টা—সবকিছুতেই অধর্মের আশ্রয় নিয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ দুর্যোধনকে অনেকবার শান্তিস্থাপনের সুযোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি "বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচ্যগ্র মেদিনী" বলে যুদ্ধ অনিবার্য করে তোলেন। যেখানে ধর্ম নেই, সেখানে জয়ও সম্ভব নয়।
৫. ঋষি ব্যাসদেবের বর ও ভাগ্যের লিখন
গান্ধারী ঋষি ব্যাসদেবের সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে একশ পুত্রের বর পেয়েছিলেন। কিন্তু প্রকৃতি বা ভাগ্যের নিয়ম হলো, যা সৃষ্টি হয় তার বিনাশও সুনির্দিষ্ট। কৌরবরা ছিলেন কলিযুগের অংশ (দুর্যোধন কলির অবতার হিসেবে পরিচিত), তাই পৃথিবীর ভার লাঘব করার জন্য তাদের বিনাশ ছিল অনিবার্য।
গান্ধারী শত পুত্রের জননী হয়েও তাদের রক্ষা করতে পারেননি কারণ তাঁর পুত্ররা ধর্মের পথ ত্যাগ করেছিলেন। এমনকি গান্ধারী নিজেও দুর্যোধনকে বলেছিলেন— "যতো ধর্মস্ততো জয়ঃ" (যেখানে ধর্ম, সেখানেই জয়)। কৌরবদের বিনাশ মূলত পূর্বজন্মের অভিশাপ এবং তাদের নিজ হাতে করা অধর্মের সম্মিলিত ফল।


