🌿 হিন্দু শাস্ত্রমতে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির রহস্য অত্যন্ত গভীর এবং বহুমাত্রিক। এটি বিভিন্ন শাস্ত্রে (বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, গীতা ইত্যাদি) বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মূলত তিনটি স্তরে এ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়:
১. বেদের দৃষ্টিতে
ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তে (ঋগ্বেদ ১০.১২৯) বলা হয়েছে—
"সৃষ্টি হওয়ার আগে কিছুই ছিল না— না অস্তিত্ব, না অনস্তিত্ব; না গগন, না দিগন্ত। কেবল এক অজ্ঞাত, পরম তত্ত্ব বিদ্যমান ছিল। তারই ইচ্ছায় সৃষ্টি প্রকাশ পায়।"
অর্থাৎ, ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির পূর্বে কেবল পরম সত্তা (ব্রহ্ম) ছিলেন। তাঁর ইচ্ছা (শক্তি) থেকেই মহাবিশ্বের উদ্ভব।
২. পুরাণ মতে
শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণ ও অন্যান্য পুরাণে বলা হয়েছে—
শ্রীকৃষ্ণ বা মহাবিষ্ণু অনাদি-অব্যয়।
তাঁর যোগনিদ্রা অবস্থায় মহাবিষ্ণুর নিঃশ্বাসে অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি ও লয় হয়।
তিনি যখন নিশ্বাস ছাড়েন তখন কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড বের হয়, আর নিশ্বাস টানলে সব আবার তাঁর মধ্যেই লীন হয়।
👉 প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডে ব্রহ্মার জন্ম হয়। ব্রহ্মা আবার বিষ্ণুর আদেশে স্থূল সৃষ্টি করেন— আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল, ভূমি; তারপর দেবতা, মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ইত্যাদি।
৩. গীতার ব্যাখ্যা
শ্রীকৃষ্ণ বলেন (ভগবদ্গীতা ৯.১০):
মায়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূযতে সচরাচরम्।
হেতুনানেন কৌন্তেয় জগদ্বিপরিভর্ততে।।
অর্থাৎ,
"আমি প্রকৃতির অধিপতি। আমার তত্ত্বদৃষ্টি (অধ্যক্ষতা) দ্বারা প্রকৃতি এই জড় জগৎকে (চরাচর) সৃষ্টি করে।"
এখানে বোঝানো হয়েছে যে, প্রকৃতি আসলে যন্ত্র— কিন্তু সেই যন্ত্র চালান স্বয়ং পরম পুরুষোত্তম ভগবান।
৪. রহস্যের সারমর্ম
ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি একটি লীলাময় প্রক্রিয়া— ভগবানের শক্তি প্রকাশের আনন্দ।
মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয় আবার লয় হয়, এটি চক্রাকারে চলে (সৃষ্টি → স্থিতি → প্রলয় → পুনঃসৃষ্টি)।
মানুষের জ্ঞান দিয়ে এই রহস্য পুরোপুরি ধরা যায় না, কিন্তু শাস্ত্র আমাদের ইঙ্গিত দেয় যে, এর মূল কারণ ভগবানের ইচ্ছা ও শক্তি।
✨ সংক্ষেপে:
হিন্দু শাস্ত্রমতে এই ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি কেবল দৈবক্রমে হয়নি, বরং এটি ভগবানের ইচ্ছা ও শক্তির ফল। তিনি যেমন খেলাচ্ছলে নিঃশ্বাস ত্যাগ ও গ্রহণ করেন, তেমনই কোটি কোটি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি ও লয় হয়।


