জগন্নাথ দেবের অপ্রচলিত ও অসমাপ্ত রূপের পেছনে পৌরাণিক কাহিনী, গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন এবং ঐতিহাসিক পটভূমি যুক্ত রয়েছে।
১. পৌরাণিক কাহিনী (কিংবদন্তি)
স্কন্দ পুরাণ ও পদ্ম পুরাণ অনুসারে, মালবের রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন জগন্নাথ দেবের মূর্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ভগবান বিষ্ণুর নির্দেশে বৃদ্ধ কারিগর রূপ ধরে স্বয়ং বিশ্বকর্মা মূর্তি তৈরির দায়িত্ব নেন। তিনি শর্ত দেন যে ২১ দিন একটি বন্ধ ঘরে তিনি একা কাজ করবেন এবং সেই সময় কেউ দরজা খুলতে পারবে না।
কিন্তু ১৪ দিন পার হওয়ার পর ভেতর থেকে কোনো শব্দ না পেয়ে রানী গুণ্ডিচার উদ্বেগে রাজা দরজা খুলে ফেলেন। শর্ত ভাঙায় বিশ্বকর্মা অদৃশ্য হয়ে যান এবং মূর্তিগুলোর হাত, পা ও আঙুল অসমাপ্ত থেকে যায়। রাজা এতে অনুশোচনা করলে দৈববাণী হয় যে, ভগবান এই অসমাপ্ত ও অদ্ভুত রূপেই জগতে পুজিত হতে চান।
২. আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক অর্থ
হাত ও পা না থাকা (সর্বব্যাপী সত্তা): উপনিষদের মূল দর্শন "অপাণিপাদো জবনো গ্রহীতা"—অর্থাৎ পরমেশ্বর পরমাত্মার কোনো নির্দিষ্ট লৌকিক হাত বা পা নেই, অথচ তিনি সবকিছু গ্রহণ করেন এবং সর্বত্র অবস্থান করেন।
বিশাল গোলাকার চোখ: জগন্নাথ দেবের বিশাল গোলাকার চোখ প্রকাশ করে ভক্তদের প্রতি তাঁর অসীম করুণা ও সর্বদা জাগ্রত দৃষ্টি।
দারু বা কাঠের বিগ্রহ: সাধারণত হিন্দু দেব-দেবীদের মূর্তি পাথর বা ধাতুর তৈরি হলেও জগন্নাথ দেব কাঠের (নিম কাঠ)। এটি সংসারের পরিবর্তনশীলতা ও নশ্বরতার প্রতীক। প্রতি ১২ থেকে ১৯ বছর পর পর 'নবকলেবর' অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুরনো মূর্তি বদলে নতুন মূর্তি তৈরি করা হয়, যা আত্মার অমরতা ও দেহের পরিবর্তনের মূল তত্ত্ব প্রকাশ করে।
৩. উপজাতীয় বা ঐতিহাসিক মূল
ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে, জগন্নাথ দেবের সূচনা হয়েছিল আদিবাসী শবর উপজাতির 'নীলমাধব' পূজার মাধ্যমে। কাঠ বা গাছের গুঁড়ি পূজার প্রাচীন উপজাতীয় ঐতিহ্য থেকেই পরবর্তীতে আজকের শ্রীজগন্নাথ রূপের বিবর্তন ঘটেছে।


