সধবাদের নাকি একাদশী করতে নেই? এব্যাপারে শাস্ত্রসমূহের কি বলা হয়েছে?
1 answers
668 views
Uzzwal Dhali
Eva Dhali
Dip Kar
+3
Answer
Login

আরও পড়ুন ...

1 Answer

“সধবা মানে বিবাহিতা নারী একাদশী পালন করতে পারবেন কিনা” এই বিষয়ে বহু মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। আসুন আমরা শাস্ত্রসম্মত রেফারেন্স দেখে স্পষ্ট ধারণা গ্রহন করি।

প্রথমতঃ শাস্ত্রে একাদশী ব্রত সম্বন্ধে কোথাও নারী-পুরুষ ভাগ করে বলা হয়নি। তাই একাদশী মূলতঃ সকলের জন্য ই প্রযোজ্য।

— ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র
— ব্রহ্মচারী, গৃহস্থ, সন্ন্যাসী, নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, যুবক
— বিবাহিতা (সধবা) নারী, বিধবা, কুমারী – সকলের জন্যই একাদশী ব্রত পালন করা শ্রেয়।

পদ্ম পুরাণ এর উত্তরখণ্ডে এ বলা হয়েছে —
স্ত্রীণাং চ বিশেষেণ কর্তব্যং হরিবাসরম্। ৫১.৬৭
অর্থঃ বিশেষ করে নারীদের একাদশী ব্রত পালন করা উচিত।

সধবা নারীদের ব্রত পালনের গুরুত্ব কি?
✅ সধবা নারীর মূল ব্রত সৌভাগ্য রক্ষা এবং স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনা। একাদশী উপবাসও এই উদ্দেশ্যকে পূরণ করে, কারণ বিষ্ণুর উপাসনা করলে সকল মঙ্গল লাভ হয়।
✅ অনেক অঞ্চলে লোকাচার (প্রথাগত বিশ্বাস) থেকে বলা হয় যে সধবা নারীরা একাদশী উপবাস না করে স্বামীকে আহার করান, কিন্তু শাস্ত্রে কোথাও একাদশী ব্রত করতে মানা করা হয়নি

3️⃣ একাদশী ব্রত পালন না করার মিথ্যের উৎপত্তিঃ
এই ধারণা মূলত এসেছে কিছু প্রাচীন সমাজপ্রথা ও লোকাচার থেকে, যেখানে বলা হত সধবা নারীকে বেশি কষ্ট করা উচিত নয়

কিন্তু শাস্ত্র অনুযায়ী, নারী-পুরুষ সবাই সমানভাবে ব্রত পালন করতে পারেন

4️⃣ যদি স্বামী বারণ করেন?
✅ স্বামী যদি স্ত্রীকে উপবাস করতে মানা করেন, তাহলে স্ত্রীর কর্তব্য হল স্বামীর আজ্ঞা পালন করা, কিন্তু অন্তরে ব্রতের উদ্দেশ্য রাখতে হবে।
✅ শাস্ত্রে বলা হয়েছে, স্ত্রীকে সর্বদা স্বামীর কথার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে, তাই স্বামীর অনুমতি ছাড়া ব্রত না করাও ধর্মসঙ্গত হতে পারে। তবে স্বামী সম্মত হলে স্ত্রীও একাদশী পালন করতে পারে।

অবশ্যই! সধবা (বিবাহিতা) নারীদের একাদশী ব্রত পালন সম্পর্কে শাস্ত্রসম্মত রেফারেন্সগুলি নিচে উপস্থাপন করা হলোঃ

পদ্ম পুরাণ (ব্রহ্মখণ্ড, অধ্যায় ৫, শ্লোক ১৯):
যা স্ত্রী পতি-সহিতা: কুর্যাৎ হরিবাসরম্।
সু-পুত্রা ভর্তৃ-সুভগা ভবেত্ সা প্রতি-জন্মনি॥

বাংলা অনুবাদঃ যে স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে একাদশী ব্রত পালন করে, সে জন্মে জন্মে সপুত্রা ও স্বামীসুভাগা হয়।

📜 পদ্ম পুরাণ (ত্রিয়াযোগসার, অধ্যায় ২২, শ্লোক ১০৫):

যা নারী ভর্তৃসহিতা করোত্যেকাদশীব্রতম্।
সুপ্রজা স্বামিসুভগা সা ভবেত্ প্রতিজন্মনি॥
স্বামিনা সহ যা নারী কুরুতে জাগরং হরে।
সা তিষ্ঠেদ্বিষ্ণুভবনে চিরং ভর্ত্রা সহ দ্বিজ॥

বাংলা অনুবাদঃ যে নারী স্বামীর সঙ্গে একাদশী ব্রত পালন করে, সে জন্মে জন্মে সুপুত্রা ও স্বামীসুভাগা হয়। আর যে নারী স্বামীর সঙ্গে জাগরণ করে, সে স্বামীর সঙ্গে চিরকাল বিষ্ণুলোকে অবস্থান করে।

📜 পদ্ম পুরাণ (উত্তরখণ্ড, অধ্যায় ৪৮, শ্লোক ৪):
দুর্ভগা যা করোত্যেনাং সা স্ত্রী সৌভাগ্যমাপ্নুয়াত্।
লোকানাং চৈব সর্বেষাং ভুক্তিমুক্তিপ্রদায়িনী॥

বাংলা অনুবাদঃ যে দুর্ভাগা স্ত্রী একাদশী ব্রত পালন করে, সে সৌভাগ্য লাভ করে। এই ব্রত সর্বলোকের জন্য ভুক্তি ও মুক্তি প্রদানকারী।

📜 বৃহন্নারদীয় পুরাণ (অধ্যায় ২১, শ্লোক ২):
ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রাণাং চৈব যোষিতাম্।
মোক্ষদং কুর্বতাং ভক্ত্যা বিষ্ণোঃ প্রিয়তরং দ্বিজাঃ॥

বাংলা অনুবাদঃ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এবং নারীদের মধ্যে যারা ভক্তিভরে একাদশী ব্রত পালন করে, তারা মোক্ষ লাভ করে এবং বিষ্ণুর প্রিয় হয়।

📜 বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ (খণ্ড ৩, অধ্যায় ১২, শ্লোক ৪৭):
সপুত্রশ্চ সভার্যশ্চ স্বজনৈর্ভক্তিসংযুক্তঃ।
একাদশ্যামুপবাসেত্ পক্ষয়োরুভয়োরপি॥

বাংলা অনুবাদঃ পুত্র, স্ত্রী ও স্বজনদের সঙ্গে ভক্তিসহকারে উভয় পক্ষের একাদশীতে উপবাস করা উচিত।

📜 শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ (স্কন্ধ ৯, অধ্যায় ৪, শ্লোক ২৯):
আরাধয়িষুঃ কৃষ্ণং মহিষ্যা তুল্যশীলয়া।
যুক্তঃ সংবৎসরং বীরো দধার দ্বাদশীব্রতম্॥

বাংলা অনুবাদঃ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করার জন্য অম্বরীষ মহারাজ তাঁর গুণবতী স্ত্রীসহ এক বৎসর যাবৎ একাদশী ও দ্বাদশী ব্রত পালন করেছিলেন।

📜 স্কন্দ পুরাণ (বিষ্ণু খণ্ড, কার্তিক মাস মাহাত্ম্য, অধ্যায় ১৩, শ্লোক ১২):
ব্রতদ্বয়ং তয়া সম্যগাজন্মমরণান্তকৃতম্।
একাদশী-ব্রতং সম্যক্ সেবনং কার্তিকস্য চ॥

বাংলা অনুবাদঃ চন্দ্রের পত্নী গুণবতী জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একাদশী ও কার্তিক মাসের ব্রত সঠিকভাবে পালন করেছিলেন।

📜 গর্গ সংহিতা (মাধুর্য খণ্ড, অধ্যায় ৯, শ্লোক ২৩-২৪):

শ্রীনারদ উবাচ —
ইতি রাধামুখাচ্ছুত্বা যজ্ঞসীতাশ্চ গোপিকাঃ।
একাদশীব্রতং চক্র বিধিবৎ কৃষ্ণলালসাঃ॥
একাদশীদিনে নাপি প্রসন্নঃ শ্রীহরিঃ স্বয়ং।
মার্গশীর্ষে পূর্ণিমায়াং রাসং তাতিচচকার হ॥

বাংলা অনুবাদঃ নারদ বললেন, রাধার মুখ থেকে একাদশীর মাহাত্ম্য শুনে যজ্ঞসীতা ও গোপীগণ কৃষ্ণপ্রাপ্তির জন্য যথাবিধি একাদশী ব্রত পালন করেন; তাঁদের একাদশী ব্রতের ফলে স্বয়ং শ্রীহরি প্রসন্ন হয়ে অগ্রহায়ণ মাসের পূর্ণিমায় তাঁদের সঙ্গে রাসনৃত্য করেন।

উপরোক্ত শাস্ত্রসম্মত রেফারেন্সগুলি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে সধবা (বিবাহিতা) নারীদের জন্য একাদশী ব্রত পালন সম্পূর্ণরূপে অনুমোদিত এবং তা তাদের জন্য কল্যাণকর। এমনকি স্বামীর সঙ্গে একাদশী ব্রত পালন করলে তা আরও মঙ্গলজনক বলে বিবেচিত।

শাস্ত্রে কোথাও বলা হয়নি যে সধবা নারী একাদশী পালন করতে পারবে না।
✅ একাদশী ব্রত নারী-পুরুষ সকলের জন্য প্রযোজ্য
✅ তবে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক বোঝাপড়া থাকা উচিত।
✅ সধবা নারীর ব্রত পালন করলে স্বামীর মঙ্গল কামনা করা উচিত।

Uzzwal Dhali
+1