দেবী দুর্গাকে ‘মহামায়া’ বলা হয়, কারণ তিনি পরমেশ্বরী বা সৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি এবং সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে তাঁর অলৌকিক মায়াশক্তি দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। ধর্মীয় শাস্ত্র ও দর্শন অনুযায়ী এর পেছনে প্রধান কয়েকটি কারণ রয়েছে:
১. সৃষ্টির মূল শক্তি ও মায়ার রূপ
‘মায়া’ শব্দের অর্থ যা পরিবর্তনশীল ও জাগতিক বাস্তবতাকে ঢেকে রাখে। দেবী দুর্গা হলেন ঈশ্বরের সেই মহাশক্তি, যা দিয়ে সমগ্র বিশ্ব সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় পরিচালিত হয়। তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি জীবের মধ্যে চেতনা, বুদ্ধি, তৃষ্ণা ও প্রজ্ঞারূপে অবস্থান করেন, যা আমাদের জগৎসংসারের সাথে বেঁধে রাখে।
২. যোগনিদ্রা ও মহাজাগতিক মোহ
শ্রীশ্রীচণ্ডী (দেবীমাহাত্ম্যম্) গ্রন্থে বলা হয়েছে, মহামায়া পরমেশ্বর ভগবানের 'যোগনিদ্রা' রূপ। সৃষ্টির প্রাক্কালে বা বিপদের সময়ে তিনি বিষ্ণুকে যোগনিদ্রায় মগ্ন রাখেন, আবার দেবকাজের স্বার্থে সেই মায়া প্রত্যাহার করে বিশ্বকে রক্ষা করেন। তাঁর ইচ্ছাতেই জগতের জীব মোহ ও মায়াজালে আবদ্ধ হয়, আবার তাঁর কৃপাতেই জীব মুক্তি পায়।
৩. বিদ্যা ও অবিদ্যা—দুই রূপ
মহামায়াকে শাস্ত্র দুটি প্রধান রূপে বর্ণনা করে:
অবিদ্যা মায়া: যা মানুষকে জাগতিক কাম, ক্রোধ, লোভ ও মোহে অন্ধ করে রাখে এবং সংসারে আবদ্ধ করে।
বিদ্যা মায়া: যা মানুষকে অজ্ঞানতা থেকে মুক্ত করে পরম সত্য ও ঈশ্বরের জ্ঞান লাভ করতে সাহায্য করে।
৪. অসুরদলনী ও বিশ্ব রক্ষাকর্ত্রী
যখনই জগতে অধর্ম ও অসুরের অত্যাচার বৃদ্ধি পায় (যেমন মহিষাসুর, শুম্ভ-নিশুম্ভের প্রাদুর্ভাব), তখন মহামায়া তাঁর দুর্গা রূপে আবির্ভূত হন। তিনি অশুভ শক্তিকে দমন করে মহাজাগতিক ভারসাম্য বা ধর্ম পুনর্প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি একাধারে জগৎকে মায়াজালে আবদ্ধ রাখার শক্তি, আবার সাধক ও ভক্তদের সেই মায়াজাল ছিন্ন করে মুক্তির পথ দেখানোর পরম জননী। এজন্যই দেবী দুর্গাকে 'মহামায়া' বলা হয়।


