হ্যাঁ, কামনা-বাসনা থাকলেও ভগবানকে লাভ করা সম্ভব। শ্রীমদ্ভাগবতে এর চমৎকার সমাধান দেওয়া হয়েছে। কামনা-বাসনা থাকা সত্ত্বেও ভগবানের প্রতি ভক্তি কীভাবে মানুষকে পরম লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়, শ্রীমদ্ভাগবতের দ্বিতীয় স্কন্ধের তৃতীয় অধ্যায়ের দশম শ্লোকে কি বলছেন....
“অকামঃ সর্বকামো বা মোক্ষকাম উদারধীঃ।
তীব্রেণ ভক্তিযোগেন যজেত পুরুষং পরম্।।”
যে ব্যক্তি নিষ্কাম, বা যার সকল প্রকার কামনা রয়েছে, অথবা যে মোক্ষ (মুক্তি) কামনা করে—সেই উদারবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি যদি ভক্তিযোগের মাধ্যমে পরমেশ্বর ভগবানের উপাসনা করে, তবে সে সিদ্ধি লাভ করে।
এই শ্লোকের মূল তাৎপর্য হলো—ভগবানের ভক্তি কোনো সাধারণ কর্ম নয়। জাগতিক কামনা বা বাসনা মানুষের মনে থাকবেই, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ভাগবতের শিক্ষা হলো—এই কামনাকে ত্যাগ করার জন্য জোর করার প্রয়োজন নেই, বরং সেই কামনার লক্ষ্য পরিবর্তন করতে হবে।
যখন একজন মানুষের মনে জাগতিক ভোগের ইচ্ছা থাকে, তখন সে সেই ইচ্ছাগুলো নিয়ে যদি সরাসরি ভগবানের কাছে যায়, তবে ভগবানই সেই ব্যক্তির মনের ময়লা দূর করে তাকে শুদ্ধ করে দেন। ভগবান নিজে তাকে এমনভাবে প্রভাবিত করেন যে, তার জাগতিক কামনাগুলো ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায় এবং কেবল ভগবৎ প্রেমের কামনা অবশিষ্ট থাকে। এখানে ভক্তিই হলো সেই "অগ্নি", যা কামনার রূপ পরিবর্তন করে তাকে ভগবানের সেবায় নিয়োজিত করে।
একটি ছোট শিশুর কথা চিন্তা করুন। শিশুটি তার মায়ের কাছে আবদার করে, "মা, আমাকে চকলেট দাও।" এখন মা যদি সেই শিশুকে চকলেট না দিয়ে সব সময় বলে, "চকোলেট খাওয়া খারাপ, শুধু পড়াশোনা কর," তবে শিশুটি মানবে না। কিন্তু বিচক্ষণ মা জানেন, এই শিশুটি তাঁর পরম প্রিয়। তিনি তাকে আদর করে কোলে বসাবেন, চকোলেটও দেবেন, কিন্তু ধীরে ধীরে তার মনকে নিজের প্রতি আকর্ষিত করবেন। একসময় সেই শিশুটি চকোলেটের থেকেও তার মাকে বেশি ভালোবাসতে শুরু করবে। তখন চকোলেটের চাহিদা তার কাছে গৌণ হয়ে যাবে।
ভগবানও ঠিক তাই করেন। ভক্ত যখন জাগতিক কামনার বোঝা নিয়ে তাঁর কাছে যায়, ভগবান তাকে ফিরিয়ে দেন না। তিনি তার জীবনের ঘটনাপ্রবাহ এমনভাবে সাজান যে, ভক্ত খুব দ্রুত বুঝতে পারে—জাগতিক জিনিসের চেয়ে ভগবানের সান্নিধ্য বা তাঁর নাম নেওয়া অনেক বেশি আনন্দদায়ক। একসময় সেই "কামনা" রূপান্তর হয়ে "প্রেমে" পরিণত হয়। তাই ভক্তিই একমাত্র পথ, যা কামনার উর্ধ্বে গিয়েও ঈশ্বরকে পাওয়ার উপায় করে দেয়।
অর্থাৎ, কোনো কিছু পাওয়ার জন্য অধৈর্য না হয়ে ভগবানের নাম বা সেবার প্রতি যদি আমরা নিষ্ঠাবান হই, তবে ভগবান নিজে এসে আমাদের হৃদয়ের কামনাগুলো বদলে দেবেন। আমাদের কষ্ট করে কামনা ত্যাগ করতে হবে না, বরং কামনার লক্ষ্য পরিবর্তন হয়ে যাবে। একসময় ভগবানকেই পাওয়ার প্রবল কামনা (কৃষ্ণ-প্রেম) আমাদের সমস্ত জাগতিক কামনার জায়গা দখল করে নিয়েছে।


