এখানে একটি দারুণ কৌশলগত ও আদর্শিক গল্প রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের রথের সারথি (পার্থসারথি) হওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল অর্জুনের নিজস্ব পছন্দ এবং তাঁদের মধ্যের গভীর সম্পর্কের রসায়ন।
১. অর্জুনের ব্যক্তিগত পছন্দ
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে দুর্যোধন ও অর্জুন দুজনই সাহায্য চাইতে শ্রীকৃষ্ণের কাছে দ্বারকায় যান। শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের সামনে দুটি বিকল্প রাখেন:
একদিকে: তাঁর সুবিশাল ও পরাক্রমশালী 'নারায়ণী সেনা'।
অন্যদিকে: তিনি নিজে, তবে তিনি কোনো অস্ত্র ধরবেন না এবং যুদ্ধ করবেন না।
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে প্রথম বেছে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। দুর্যোধন মনে মনে ভেবেছিলেন অস্ত্রহীন একজন মানুষ যুদ্ধের ময়দানে কোনো কাজেরই নয়, তাই তিনি বিশাল সৈন্যবাহিনী বেছে নেন। অন্যদিকে অর্জুন কোনো সৈন্য চাননি; তিনি জানতেন শ্রীকৃষ্ণের উপস্থিতি এবং সঠিক দিকনির্দেশনা হাজার হাজার সৈন্যের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। তাই তিনি শ্রীকৃষ্ণকেই সারথি হিসেবে বেছে নেন।
২. সঠিক দিকনির্দেশনা ও মানসিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা
প্রাচীনকালের যুদ্ধে রথের সারথি কেবল ঘোড়া চালাতেন না—তিনি ছিলেন রথীর সবচেয়ে বড় পরামর্শদাতা, কৌশলবিদ ও যুদ্ধের অভিভাবক। কুরুক্ষেত্রের মতো মহাভারতের জটিল যুদ্ধে পাণ্ডবদের পক্ষে এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল যিনি প্রতি মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন।
৩. গীতার বাণী ও ধর্মের পথ প্রদর্শন
যুদ্ধের একদম শুরুতে পরমাত্মীয়দের বিপক্ষে লড়তে দেখে অর্জুন যখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং অস্ত্র ত্যাগ করেন, তখন সারথির আসনে থাকা শ্রীকৃষ্ণই তাঁকে মোহের হাত থেকে রক্ষা করেন। তিনি অর্জুনকে তাঁর ক্ষত্রিয় ধর্ম ও কর্মের মূল শিক্ষা দেন, যা আজকে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা নামে পরিচিত।
সহজ কথায়, শ্রীকৃষ্ণ সারথি হয়ে রথের লাগাম ধরেছিলেন ঠিকই, কিন্তু মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্জুনের মনকে সঠিক পথে চালনা করা এবং ধর্মের জয় সুনিশ্চিত করা।


