রাবণ মূলতঃ কে ছিলেন?
1 answers
15 views
Answer
Login
1 Answer

রামায়ণের মূল খলনায়ক হিসেবে আমরা রাবণকে চিনলেও, হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীতে তাঁর পরিচয় কেবল একজন "রাক্ষস রাজা"র মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছিলেন একাধারে পরম শিবভক্ত, মহাজ্ঞানী পণ্ডিত, দক্ষ শাসক এবং এক জটিল চরিত্রের অধিকারী।

রাবণের মূল পরিচয় এবং তাঁর ব্যাকগ্রাউন্ড নিচে কয়েকটি ভাগে আলোচনা করা হলো:

১. জন্ম ও বংশপরিচয় (অর্ধ-ব্রাহ্মণ ও অর্ধ-রাক্ষস)

রাবণ জন্মসূত্রে সম্পূর্ণ রাক্ষস ছিলেন না, তাঁর বংশলতিকা বেশ অভিজাত ছিল:

  • পিতা: মহর্ষি বিশ্রবা (যিনি ছিলেন সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার পৌত্র এবং ঋষি পুলস্ত্যের পুত্র)। সেই সূত্রে রাবণ একজন ব্রাহ্মণ ছিলেন।

  • মাতা: রাক্ষস রাজকন্যা কৈকসী। পিতা-মাতার এই মিলনের কারণে রাবণের মধ্যে ব্রহ্মতেজ (জ্ঞান) এবং রাক্ষসী শক্তি (মহাকায় রূপ ও উগ্রতা)—উভয়েরই সংমিশ্রণ ঘটেছিল। ধনকুবের কুবের ছিলেন রাবণের সৎ ভাই।

২. মহাজ্ঞানী ও মহাপণ্ডিত

লঙ্কার রাজা হওয়ার আগে রাবণ ছিলেন একজন অসাধারণ ছাত্র ও সাধক। চার বেদ, ছয় শাস্ত্র এবং সমস্ত নীতিবিদ্যায় তিনি পারদর্শী ছিলেন। জ্যোতির্বিদ্যা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানেও তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল (বলা হয়, তিনি 'রাবণ সংহিতা' নামক জ্যোতিষ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন)। তাঁর এই বিশাল জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার প্রতীক হিসেবেই তাঁকে "দশগ্রীব" বা "দশমাথা" বিশিষ্ট হিসেবে রূপক অর্থে প্রকাশ করা হয়।

৩. পরম শিবভক্ত

রাবণকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা শিবভক্ত মনে করা হয়। তিনি শিবকে প্রসন্ন করার জন্য কঠোর তপস্যা করেছিলেন এবং নিজের মাথা কেটে মহাদেবকে অর্পণ করতেও দ্বিধা করেননি। শিবের স্তুতি গেয়ে তিনি "শিব তাণ্ডব স্তোত্র" রচনা করেছিলেন, যা আজও সনাতন ধর্মে অত্যন্ত জনপ্রিয়। মহাদেব তাঁর ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে 'চন্দ্রহাস' নামক অপরাজেয় তলোয়ার উপহার দিয়েছিলেন।

৪. বরদান ও লঙ্কার রাজা

রাবণ ও তাঁর ভাইয়েরা (কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণ) ব্রহ্মার কঠোর তপস্যা করেন। ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হয়ে বর দিতে চাইলে রাবণ অমরত্ব প্রার্থনা করেন। কিন্তু অমরত্ব দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় তিনি বর নেন যে—কোনো দেবতা, গন্ধর্ব, যক্ষ, রাক্ষস বা নাগ তাঁকে বধ করতে পারবে না। (মানুষ এবং বানরকে তুচ্ছ ভেবে রাবণ তাদের হাত থেকে সুরক্ষার বর চাননি, যা পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়)।

এই বর পাওয়ার পর রাবণ তাঁর সৎ ভাই কুবেরকে পরাজিত করে স্বর্ণলঙ্কা (সোনার লঙ্কা) দখল করেন এবং রাক্ষসদের রাজা হন। তাঁর শাসনামলে লঙ্কা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও ধন-ধান্যে পূর্ণ ছিল।

৫. পূর্বজন্মের ইতিহাস (জয়-বিজয়)

পৌরাণিক তত্ত্ব অনুযায়ী, রাবণ মূলত বৈকুণ্ঠে ভগবান বিষ্ণুর দ্বাররক্ষী (পাহারাদার) "জয়" ছিলেন। চার কুমারের অভিশাপের কারণে জয় ও বিজয়কে মর্ত্যে জন্ম নিতে হয়েছিল। অভিশাপ মুক্তির উপায় হিসেবে তাঁরা বিষ্ণুর শত্রু হিসেবে ৩ বার জন্ম নেওয়া বেছে নেন (যাতে ভগবানের হাতে মরে দ্রুত বৈকুণ্ঠে ফিরতে পারেন)।

  • প্রথম জন্মে তাঁরা ছিলেন: হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপু।

  • দ্বিতীয় জন্মে (রামায়ণে): রাবণ ও কুম্ভকর্ণ।

  • তৃতীয় জন্মে (মহাভারতে): শিশুপাল ও দন্তবক্র।

সংক্ষেপে: রাবণ ছিলেন একজন জন্মগত পণ্ডিত ও শিবভক্ত, যিনি অহংকার, ক্ষমতার লোভ এবং পরস্ত্রী (সীতা) হরণের কারণে নিজের পতন ডেকে এনেছিলেন। শাস্ত্রে তাঁকে খলনায়ক বলা হলেও তাঁর জ্ঞান ও বীরত্বকে সবসময় সম্মান জানানো হয়েছে।