সনাতন ধর্ম ও সমাজব্যবস্থায় "সংসার ধর্ম" বলতে মূলত বিবাহিত জীবন যাপন করা এবং পরিবারের প্রতি নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করাকে বোঝায়। ভারতীয় দর্শনে মানুষের জীবনকে যে চারটি ভাগে বা আশ্রমে ভাগ করা হয়েছে (ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস), তার মধ্যে দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আশ্রম হলো "গার্হস্থ্য আশ্রম"। এই গার্হস্থ্য জীবনের নিয়ম ও কর্তব্য পালন করাই হলো সংসার ধর্ম।
সংসার ধর্মের মূল বিষয়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন (ঋণ স্বীকার)
সংসার ধর্মে একজন মানুষকে কেবল নিজের সুখের কথা ভাবলে চলে না। তাকে সমাজ এবং পরিবারের প্রতি কিছু ঋণ বা কর্তব্য পূরণ করতে হয়:
পিতৃঋণ: বিবাহ করে সন্তান জন্ম দেওয়া এবং বংশের ধারা বজায় রাখা। সন্তানকে সৎ ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
মনুষ্যঋণ: পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং সমাজের মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো ও সেবা করা।
দেব ও ঋষি ঋণ: ঈশ্বর আরাধনা এবং সৎ জ্ঞান অর্জন ও তা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া।
২. অর্থ ও কাম-এর সংযত চর্চা
মানুষের জীবনের চারটি পুরুষার্থ রয়েছে—ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ। সংসার ধর্মে থেকে একজন মানুষ সৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করবে (অর্থ) এবং বিবাহিত জীবনে বংশবিস্তার ও সুখ লাভ করবে (কাম)। তবে তা হতে হবে সম্পূর্ণ ধর্ম ও নীতির ভেতরে থেকে।
৩. ত্যাগের সাধনা
বাইরে থেকে মনে হতে পারে সংসার মানে কেবলই ভোগ-বিলাস, কিন্তু আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে সংসার হলো ত্যাগের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া, বৃদ্ধ পিতা-মাতার সেবা করা এবং পরিবারের সবাইকে আগলে রাখার মাধ্যমে মানুষের ভেতরের অহংকার দূর হয়।
৪. শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও কর্মযোগ
গীতার দৃষ্টিতে সংসার ধর্ম হলো এক প্রকার "কর্মযোগ"। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, সংসার ত্যাগ করে বনে গেলেই ঈশ্বর লাভ হয় না। বরং সংসারে থেকে, সমস্ত দায়িত্ব পালন করেও যদি কেউ ফলের আশা না করে (অনা his/her নিজের কর্তব্য করে যায় এবং সব কাজ ঈশ্বরে অর্পণ করে, তবে সে সংসারেই মুক্তি পেতে পারে। একেই বলে "সংসারে থেকেও পদ্মপাতার মতো জললিপ্ত না থাকা"।
সংক্ষেপে: বিয়ে করে স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে, পিতা বা মাতা হিসেবে এবং সমাজের একজন দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে নিজের কর্তব্যগুলো সততা, ভালোবাসা ও ধর্মের সাথে পালন করার নামই হলো সংসার ধর্ম। এটি কোনো বন্ধন নয়, বরং আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি অন্যতম মাধ্যম।


