কেনো অহংকার ত্যাগ করলে মানুষ ভগবানের নিকটবর্তী হয়?
1 answers
18 views
Answer
Login
1 Answer

নাতন ধর্ম এবং আধ্যাত্মিক দর্শনে "অহংকার"-কে মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু এবং ভগবানের পথের প্রধান বাধা হিসেবে গণ্য করা হয়। অহংকার ত্যাগ করলে মানুষের মন খাঁটি হয়, আর তখনই সে ভগবানের নিকটবর্তী হতে পারে।

এর পেছনের মূল আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. 'আমি' এবং 'ভগবান' একসাথে থাকতে পারে না

অহংকারের মূল কথাই হলো—"আমি করেছি", "আমার আছে" বা "আমিই সব"। যখন মানুষের মনে এই 'আমি' বা 'অহং' ভাব প্রবল থাকে, তখন সে নিজেকেই সবকিছুর কর্তা মনে করে।

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব খুব সহজ ভাষায় একটি উপমা দিয়ে এটি বুঝিয়েছিলেন:

"যতক্ষণ না 'আমি' মরে, ততক্ষণ ঘুচবে না জঞ্জাল। 'আমি' আর 'আমার'—এই দুটির নামই অজ্ঞান। যখনই এই 'আমি' ভাব দূর হয়, তখনই সেখানে ভগবানের প্রকাশ ঘটে।"

সহজ কথায়, একটি পাত্রে যেমন জল এবং তেল একসাথে মিশতে পারে না, তেমনি একটি হৃদয়ে অহংকার এবং ভগবান একসাথে বাস করতে পারেন না। অহংকার সরলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, ভগবান সেই স্থান পূর্ণ করেন।

২. অহংকার দূর হলে 'সমর্পণ' সহজ হয়

ভগবানকে পাওয়ার বা তাঁর নিকটবর্তী হওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ হলো শরনাগতি বা আত্মসমর্পণ। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন সর্বধর্ম ত্যাগ করে তাঁর শরণাগত হতে।

কিন্তু একজন অহংকারী মানুষ কখনো পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করতে পারে না। সে মনে করে তার বুদ্ধি, ক্ষমতা বা ধনসম্পদ দিয়ে সে সব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। যখন মানুষ বুঝতে পারে যে মহাবিশ্বের পরম শক্তির সামনে সে অত্যন্ত ক্ষুদ্র, তখন তার অহংকার ভেঙে যায়। এই অহংকারহীন মনই কেবল ঈশ্বরের চরণে সম্পূর্ণ সমর্পণ করতে পারে।

৩. অহংকার সত্যকে আড়াল করে (মায়া)

অহংকার হলো 'মায়া' বা মোহের একটি বড় রূপ। এটি মানুষকে অন্ধ করে দেয়। অহংকারী ব্যক্তি নিজের দোষ দেখতে পায় না এবং অন্যদের নিজের চেয়ে ছোট মনে করে। এর ফলে মানুষের মনে ক্রোধ, হিংসা ও লোভের জন্ম হয়, যা তাকে ঈশ্বর থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

অহংকার ত্যাগ করলে মনের এই পর্দা সরে যায়। মানুষ তখন বুঝতে পারে যে জগতের প্রতিটি জীবের মধ্যেই ঈশ্বরের অংশ (আত্মা) বিরাজ করছে। এই "সর্বভূতে ঈশ্বর দর্শন" মানুষকে সরাসরি ভগবানের কাছে নিয়ে যায়।

৪. কর্মফলের আসক্তি মুক্তি (কর্মযোগ)

গীতার মূল শিক্ষা হলো—"কর্ম করো কিন্তু ফলের আশা করো না।" অহংকারী মানুষ সবসময় কর্মের ফলের ভাগীদার হতে চায় ("আমি এই পুণ্য করেছি, তাই আমার ভালো হবে")।

কিন্তু অহংকার ত্যাগ করলে মানুষ বুঝতে পারে যে সে কেবল নিমিত্ত মাত্র, সব করানোর মালিক ঈশ্বর। যখন কেউ নিজের সব কাজ এবং কর্মফল ভগবানের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে দেয়, তখন সে পাপ-পুণ্যের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবানের পরম ধামের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

৫. নম্রতা ও ভক্তি

ভগবান শক্তির কাঙাল নন, তিনি ভক্তির কাঙাল। আর ভক্তির প্রথম শর্তই হলো নম্রতা। পুরাণ ও ইতিহাসে দেখা গেছে, রাক্ষসরাজ রাবণ বা হিরণ্যকশিপু অত্যন্ত শক্তিশালী ও জ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও কেবল অহংকারের কারণে ধ্বংস হয়েছিলেন। অন্যদিকে, অতি সাধারণ হনুমান বা শবরী কেবল তাঁদের নিরহংকার ভক্তির জোরে ভগবানের হৃদয়ে স্থান পেয়েছিলেন।

সংক্ষেপে: অহংকার হলো একটি দেয়াল যা মানুষকে তার নিজের ভেতরের পরমাত্মা বা ভগবান থেকে আলাদা করে রাখে। এই দেয়ালটি ভেঙে ফেললেই মানুষ বুঝতে পারে যে সে ঈশ্বরেরই একটি অংশ, আর এভাবেই সে ভগবানের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়।