শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কলিযুগে জীবাত্মার মুক্তি এবং কৃষ্ণপ্রেম লাভের সহজতম পথ হিসেবে হরিনাম সংকীর্তনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর এই ভাবনার মূলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল:
সর্বজনীনতা ও সাম্যবাদ: মধ্যযুগের সমাজব্যবস্থায় জাতিভেদ ও বৈষম্য প্রবল ছিল। মহাপ্রভু নামসংকীর্তনকে এমন এক মাধ্যমে রূপ দেন, যেখানে ধনী-দরিদ্র, উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ বা শাস্ত্রজ্ঞানহীন—সব মানুষের সমান অধিকার ছিল। জাত-পাত নির্বিশেষে সবাইকে এক ছাদের নিচে আনার এটিই ছিল সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
কলিযুগের শ্রেষ্ঠ ধর্ম: বৈষ্ণব শাস্ত্রানুসারে, চার যুগে ঈশ্বর আরাধনার পথ ভিন্ন (যেমন—সত্যযুগে ধ্যান, ত্রেতায় যজ্ঞ, দ্বাপরে পূজা)। কলিযুগে মানুষের পরমায়ু, স্মৃতিশক্তি ও একাগ্রতা কম বলে হরিনাম সংকীর্তনকেই এই যুগের সবচেয়ে সহজ ও শ্রেষ্ঠ ধর্ম হিসেবে নির্দেশ করা হয়েছে।
চিত্তশুদ্ধি ও প্রেম লাভ: শ্রীচৈতন্যদেবের মতে, হরেক his নাম সংকীর্তন মানুষের মনের সমস্ত অহংকার, হিংসা ও কলুষতা দূর করে (চিত্ত-দর্পণ-মার্জনম্)। কেবল আনুষ্ঠানিক পূজায় যা সম্ভব নয়, নামসংকীর্তনের সুধারসে তা সহজেই অর্জিত হয় এবং ঈশ্বরের প্রতি নিষ্কাম প্রেমের সঞ্চার ঘটে।
সহজসাধ্যতা: সংকীর্তনের জন্য কোনো কঠিন জপ-তপ, জটিল বৈদিক আচার, বড় আয়োজন বা অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয় না। যেকোনো স্থানে, যেকোনো সময়ে কেবল কণ্ঠ ছেড়ে একসঙ্গে ঈশ্বরের নাম গান করাই যথেষ্ট।
মহাপ্রভুর এই আন্দোলন শুধু একটি ধর্মীয় প্রচার ছিল না, এটি ছিল ভক্তি, সামাজিক মুক্তি ও ভালোবাসার এক সার্বজনীন বিপ্লব।


