আত্মা কোথা থেকে আসে?
1 answers
15 views
Dip Kar
+1
Answer
Login

আরও পড়ুন ...

1 Answer

সনাতন ধর্ম ও বৈদিক দর্শন অনুযায়ী, আত্মার কোনো আদি বা অন্ত নেই, তাই জাগতিক অর্থে আত্মার কোনো "জন্ম" বা নতুন করে কোথাও থেকে "আসা" হয় না। আত্মা হলো পরমেশ্বরের এক শাশ্বত, অবিভাজ্য এবং দিব্য অংশ।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও উপনিষদের আলোকে আত্মার উৎস এবং স্বরূপ নিচে সহজভাবে আলোচনা করা হলো:

১. পরমাত্মা বা ভগবানই আত্মার উৎস

বেদান্ত ও গীতার বাণী অনুযায়ী, পরমেশ্বর ভগবান (বা ব্রহ্ম) থেকেই সমস্ত আত্মার প্রকাশ। শ্রীকৃষ্ণ গীতায় স্পষ্ট করে বলেছেন:

"মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ" (গীতা ১৫.৭) অর্থাৎ: এই জড় জগতে বদ্ধ জীবসমূহ আমারই সনাতন (নিত্য) অংশ।

যেমন সূর্য থেকে অসংখ্য রশ্মি বের হয়, কিংবা অগ্নি থেকে অগ্নিকুণ্ডের হাজারো স্ফুলিঙ্গ ছিটকে পড়ে, ঠিক তেমনি পরমাত্মা বা পরম ব্রহ্ম থেকে এই সমস্ত জীবাত্মার সৃষ্টি বা প্রকাশ ঘটেছে। রশ্মি যেমন সূর্যের অংশ, আত্মাও তেমনি ভগবানের অংশ।

২. আত্মা জন্মহীন ও নিত্য

জাগতিক সবকিছুর একটা উৎপত্তিস্থল বা শুরুর সময় থাকে, কিন্তু আত্মার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় আত্মার অমরত্ব ও নিত্যতা বর্ণনা করে বলা হয়েছে:

"ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্..." (গীতা ২.২০) অর্থাৎ: আত্মার কখনো জন্ম হয় না বা মৃত্যু হয় না। এটি অজ (জন্মহীন), নিত্য, শাশ্বত এবং পুরাতন। শরীর ধ্বংস হলেও আত্মা ধ্বংস হয় না।

তাহলে আমরা যে বলি "আত্মা পৃথিবীতে এসেছে", এর অর্থ কী? এর অর্থ হলো, আত্মা নতুন কোনো শরীর ধারণ করে এই জড় জগতে প্রকট হয়েছে মাত্র।

৩. জড় জগতে আত্মার আগমন কেন?

শাশ্বত ধামে ভগবানের অংশ হিসেবে থাকার পরও আত্মা কেন এই জড় জগতে বা এই পৃথিবীতে আসে?

  • স্বাধীন ইচ্ছার অপব্যবহার: জড় দর্শন (বিশেষ করে বৈষ্ণব দর্শন) অনুযায়ী, জীবের একটি ক্ষুদ্র 'স্বাধীন ইচ্ছা' বা স্বাধীনতা রয়েছে। জীব যখন পরমেশ্বরের সেবা বা তাঁর সান্নিধ্যে থাকার চেয়ে নিজে স্বাধীনভাবে 'ভোক্তা' হতে চায়, তখন তার সেই জড় বাসনা পূরণের জন্য তাকে এই মর্ত্যলোকে পাঠানো হয়।

  • কর্মের বন্ধন: একবার এই জড় জগতে আসার পর, জীব তার কর্ম অনুযায়ী বারবার নতুন শরীর (মানুষ, পশু, পাখি ইত্যাদি) লাভ করে এক দেহ থেকে অন্য দেহে যাতায়াত করে। একেই আমরা আত্মার আসা-যাওয়া বা পুনর্জন্ম বলি।

৪. আত্মার আসল পরিচয়

উপনিষদে বলা হয়েছে, আত্মার প্রকৃত স্বভাব হলো 'সচ্চিদানন্দ'

  • সৎ: যা চিরকাল থাকে (অবিনশ্বর)।

  • চিৎ: যা জ্ঞানময় বা চেতনায় পূর্ণ।

  • আনন্দ: যা পরম সুখে মগ্ন।

সংক্ষেপে: আত্মা নতুন করে কোথাও থেকে তৈরি হয়ে আসে না। এটি ভগবানেরই এক পরম ও শাশ্বত অংশ, যা সৃষ্টির শুরু বা শেষের ঊর্ধ্বে। জড় জগতের মোহ এবং কর্মফলের কারণে আত্মা এক দেহ থেকে অন্য দেহে স্থানান্তরিত হয় মাত্র, আর এর পরম লক্ষ্য হলো পুনরায় পরমাত্মা বা ভগবানের চরণে ফিরে যাওয়া।