পুরুষোত্তম মাস, যা সাধারণ মানুষের কাছে 'মলমাস' বা 'অধিক মাস' নামেও পরিচিত, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র একটি সময়। এটি মূলত হিন্দু পঞ্জিকার একটি অতিরিক্ত মাস, যা প্রতি তিন বছর (প্রায় ৩২ মাস ১৬ দিন) অন্তর অন্তর আসে।
নিচে পুরুষোত্তম মাসের গুরুত্ব এবং এটি পালনের নিয়মাবলী আলোচনা করা হলো —
১. পুরুষোত্তম মাস কেনো বলা হয়? (পৌরাণিক প্রেক্ষাপট)
প্রাচীন শাস্ত্র অনুসারে, প্রতিটি মাসের একজন করে অধিপতি দেবতা থাকেন। কিন্তু এই অতিরিক্ত মাসটির কোনো অধিপতি ছিলো না বলে একে 'মলমাস' বা অশুভ মনে করা হতো। এই মাসটি তখন অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে ভগবান বিষ্ণুর শরণাপন্ন হয়।
ভগবান বিষ্ণু তখন দয়াপরবশ হয়ে এই মাসটিকে নিজের নাম দান করেন — 'পুরুষোত্তম'। তিনি আশীর্বাদ করেন যে, অন্য সব মাসের তুলনায় এই মাসে ভক্তি ও উপাসনা করলে হাজার গুণ বেশি ফল লাভ হবে। একারণেই একে পুরুষোত্তম মাস বলা হয়।
২. কিভাবে পালন করতে হয়?
এই মাসে জাগতিক বিলাসিতা ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক কাজে বেশি সময় দেওয়ার বিধান রয়েছে। পালনের প্রধান নিয়মগুলো হলো:
ক. খাদ্যাভ্যাস ও উপবাস:
অনেকে পুরো মাস হবিষ্যান্ন (আতপ চাল ও ঘি দিয়ে তৈরি নিরামিষ খাবার) গ্রহণ করেন।
— আমিষ খাবার, পেঁয়াজ, রসুন, তামাক বা যেকোনো মাদক দ্রব্য সম্পূর্ণ বর্জন করা উচিত।
— একাদশী ব্রত এই মাসে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করা হয়।
খ. নাম জপ ও পাঠ:
— প্রতিদিন ভগবান বিষ্ণু বা কৃষ্ণের নাম জপ করা। বিশেষ করে 'হরে কৃষ্ণ' মহামন্ত্র বা শ্রীবিষ্ণু সহস্রনাম পাঠ করা খুব ফলদায়ী।
— শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (বিশেষ করে ১৫তম অধ্যায়—'পুরুষোত্তম যোগ') এবং শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ করা বা শোনা অত্যন্ত শুভ।
গ. দ্বীপ দান ও আরতি:
— প্রতিদিন সন্ধ্যায় ভগবানের চরণে ঘৃত প্রদীপ নিবেদন করা (দীপদান)।
তুলসী তলায় প্রদীপ দেওয়া এবং তুলসী পরিক্রমা করা এই মাসের বিশেষ অঙ্গ।
ঘ. দান-ধ্যান:
অসহায় মানুষকে অন্ন দান, শাস্ত্রীয় গ্রন্থ দান বা সৎ কাজে অর্থ দান করা। বিশেষ করে ব্রাহ্মণ বা ভক্তদের মালপোয়া (এক ধরণের মিষ্টি) দান করার একটি প্রাচীন প্রথা এই মাসে প্রচলিত আছে।
ঙ. ব্রহ্মচর্য পালন:
মানসিক ও শারীরিক পবিত্রতা বজায় রাখা এবং কায়-মন-বাক্যে কারো ক্ষতি না করা।
৩. এই মাসে যা করা নিষিদ্ধ (বর্জনীয়):
যেহেতু এটি একটি 'অধিক' মাস এবং আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য সংরক্ষিত, তাই এই মাসে কিছু মাঙ্গলিক ও জাগতিক কাজ সাধারণত এড়িয়ে চলা হয়:
বিবাহ অনুষ্ঠান।
গৃহপ্রবেশ বা নতুন বাড়ি নির্মাণ শুরু করা।
উপনয়ন (পৈতা) বা অন্নপ্রাশন।
নতুন ব্যবসা শুরু বা বড় কোনো বিলাসদ্রব্য ক্রয়।
৪. বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
সূর্য ও চন্দ্রের গতিবিধির পার্থক্যের কারণে সৌর বছর (৩৬৫ দিন) এবং চন্দ্র বছরের (৩৫৪ দিন) মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ১১ দিনের ব্যবধান তৈরি হয়। এই ব্যবধান মেটাতেই প্রতি তিন বছর অন্তর একটি মাস যোগ করা হয়, যাতে ঋতুচক্র এবং উৎসবের সময়গুলো ঠিক থাকে।
পুরুষোত্তম মাস হলো আধ্যাত্মিক 'বোনাস' পাওয়ার মাস। যারা সারা বছর ব্যস্ততার কারণে ভক্তি করতে পারেন না, তাঁদের জন্য এটি নিজেকে শুধরে নেওয়ার এবং ভগবানের কৃপা লাভের এক বিশেষ সুযোগ।


