একাদশী ব্রত পালন হিন্দুধর্মে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর তিথি গণনা এবং পালনের সময় নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তি দেখা দেয়। প্রধানত জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গণনা এবং ভক্তি বা নিষ্ঠার আধারে একাদশীকে তিনটি প্রধান মতে বা প্রকারে বিভক্ত করা হয়েছে।
নিচে এই তিনটি মত এবং কোন মতে ব্রত রাখা শ্রেষ্ঠ, তা আলোচনা করা হলো:
১. একাদশী কেন তিনটি মতে বিভক্ত?
মূলত সূর্যোদয় এবং তিথির ব্যাপ্তি—এই দুটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে মতভেদগুলো তৈরি হয়:
বিদ্ধা একাদশী (অশুদ্ধ): যদি একাদশী তিথি শুরু হওয়ার আগে পূর্ববর্তী তিথি (দশমী) সূর্যোদয়ের সময় বা সূর্যোদয়ের ঠিক আগে (অরুণোদয় কালে) বিদ্যমান থাকে, তবে তাকে 'দশমী-বিদ্ধা' একাদশী বলা হয়। শাস্ত্র মতে, এই একাদশী পালন করলে পূর্ণ ফল পাওয়া যায় না।
শুদ্ধ একাদশী: যদি সূর্যোদয়ের সময় থেকে পরবর্তী সূর্যোদয় পর্যন্ত একাদশী তিথি অটুট থাকে এবং তাতে দশমীর কোনো স্পর্শ না থাকে, তবে তাকে শুদ্ধ একাদশী বলে।
মহাদ্বাদশী (বৈষ্ণব মত): অনেক সময় একাদশী তিথি সূর্যোদয়ের পর শুরু হয় এবং পরের দিন সূর্যোদয় পর্যন্ত স্থায়ী হয় না, কিন্তু পরের দিনটি দ্বাদশী হওয়া সত্ত্বেও সেখানে একাদশীর প্রভাব থাকে। বৈষ্ণব মতে, দশমীর সামান্য ছোঁয়া থাকলেও সেই দিন বর্জন করে পরের দিন 'মহাদ্বাদশী' হিসেবে ব্রত পালন করা হয়।
২. কেনো এই বিভক্তি? (স্মার্ত বনাম বৈষ্ণব)
এই বিভক্তি মূলত দুটি ভিন্ন ধারার অনুসারীদের জন্য:
স্মার্ত মত: যাঁরা সাধারণ গৃহস্থ এবং জ্যোতিষশাস্ত্রীয় পঞ্জিকা অনুসরণ করেন, তাঁরা অনেক সময় অরুণোদয় বা সূর্যোদয় ভিত্তিক গণনায় শুদ্ধ একাদশী পালন করেন।
বৈষ্ণব মত: ভক্তিমার্গীয় বা বৈষ্ণবগণ অত্যন্ত কঠোরভাবে 'দশমী-বিদ্ধা' বর্জন করেন। তাঁদের মতে, সূর্যোদয়ের অন্তত ১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট (৪ দণ্ড) আগে থেকে একাদশী তিথি থাকা আবশ্যক। যদি তার মধ্যে এক সেকেন্ডের জন্যও দশমী থাকে, তবে তাঁরা সেই দিন ব্রত রাখেন না; বরং পরের দিন দ্বাদশীর দিন ব্রত পালন করেন।
কোন মতে ব্রত রাখা শ্রেয়?
আধ্যাত্মিক এবং শাস্ত্রীয় বিচারে বৈষ্ণব মতে (শুদ্ধা একাদশী বা মহাদ্বাদশী) ব্রত রাখা সবথেকে শ্রেয় বলে গণ্য করা হয়। এর কারণগুলো হলো:
পবিত্রতা: বৈষ্ণব মতে দশমীর সামান্যতম প্রভাবকেও অশুভ মনে করা হয়। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও পুরাণ অনুযায়ী, 'বিদ্ধা' একাদশী পালন করলে আসুরিক শক্তির প্রভাব বাড়ে এবং পুণ্য ক্ষয় হয়।
নিশ্চয়তা: বৈষ্ণব পঞ্জিকা (যেমন ইসকন বা গৌড়ীয় মঠের পঞ্জিকা) অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে গণনা করা হয় যাতে ব্রত পালনে কোনো ত্রুটি না থাকে।
ফলপ্রাপ্তি: শাস্ত্রে বলা হয়েছে, দশমী-বিদ্ধা একাদশী পালন করলে তা ভগবানের কাছে পৌঁছায় না। পক্ষান্তরে, দ্বাদশী মিশ্রিত একাদশী (যাকে মহাদ্বাদশী বলে) পালন করলে হাজার গুণ বেশি ফল লাভ হয়।
আপনি যদি আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং সঠিক শাস্ত্রীয় ফল পেতে চান, তবে আপনার এলাকার কোনো নির্ভরযোগ্য বৈষ্ণব পঞ্জিকা অনুসরণ করা এবং সেই অনুযায়ী শুদ্ধা একাদশী পালন করা সবথেকে ভালো।
একাদশী ব্রত পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো ইন্দ্রিয় সংযম এবং ভগবানের নামস্মরণ করা। আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী নির্জলা, জল পান করে অথবা অনুকল্প (ফল ও নির্দিষ্ট সবজি) গ্রহণ করে এই ব্রত পালন করতে পারেন।


