হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী মোক্ষ বা মুক্তি হলো মানবজীবনের পরম লক্ষ্য বা 'পুরুষার্থ'। বেদ, উপনিষদ এবং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার মতো প্রধান ধর্মগ্রন্থগুলোতে মোক্ষের স্বরূপ অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী মোক্ষের বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
১. উপনিষদ অনুযায়ী: ব্রহ্মের সাথে মিলন
উপনিষদে মোক্ষকে বর্ণনা করা হয়েছে 'তত্ত্বমসি' (তুমিই সেই) বা 'অহং ব্রহ্মাস্মি' (আমিই ব্রহ্ম) এই বোধের জাগরণ হিসেবে।
অজ্ঞানতা নাশ: মানুষ মায়ার বশবর্তী হয়ে নিজেকে শরীর বা মন মনে করে। যখন উপনিষদের জ্ঞানের মাধ্যমে এই ভ্রম দূর হয়, তখন মানুষ বুঝতে পারে তার ভেতরের আত্মা আসলে পরমাত্মারই অংশ।
পূর্ণতা লাভ: নদী যেমন সাগরে মিশে গেলে নিজের আলাদা অস্তিত্ব হারিয়ে সাগরের সমান হয়ে যায়, মোক্ষ লাভ করলে আত্মাও ঠিক তেমনি পরমাত্মায় লীন হয়ে যায়।
২. শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা অনুযায়ী: কর্মফল থেকে মুক্তি
শ্রীকৃষ্ণ গীতায় মোক্ষ লাভের জন্য মূলত তিনটি প্রধান পথের কথা বলেছেন, যা একজন মানুষকে বন্ধনমুক্ত করে:
ভক্তিযোগ: সর্বস্ব ভগবানে অর্পণ করা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, "সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ" অর্থাৎ সকল ধর্ম ত্যাগ করে একমাত্র তাঁর শরণাপন্ন হলেই তিনি মোক্ষ প্রদান করবেন।
কর্মযোগ: ফল লাভের আশা না করে কর্তব্য পালন করা (নিষ্কাম কর্ম)। যখন মানুষের কোনো কাজের প্রতি আসক্তি থাকে না, তখন নতুন করে কর্মফল তৈরি হয় না, যা তাকে মুক্তির দিকে নিয়ে যায়।
জ্ঞানযোগ: সত্য ও অসত্যের পার্থক্য বোঝা। অনিত্য জগতকে ত্যাগ করে নিত্য পরমাত্মার ধ্যান করা।
৩. পুরাণ ও বৈষ্ণব শাস্ত্র অনুযায়ী: মুক্তির ৫টি প্রকার
পুরাণ বিশেষ করে শ্রীমদ্ভাগবতে মোক্ষ বা মুক্তির পাঁচটি অবস্থার কথা বলা হয়েছে, যা ভক্তরা লাভ করতে পারেন:
সাযুজ্য: ভগবানের জ্যোতির সাথে বা শ্রীবিগ্রহের সাথে সম্পূর্ণ মিশে যাওয়া।
সালোক্য: ভগবান যে লোকে (যেমন- বৈকুণ্ঠ) বাস করেন, সেই একই লোকে বাস করার অধিকার পাওয়া।
সারূপ্য: ভগবানের মতো রূপ বা আকৃতি লাভ করা।
সার্ষ্টি: ভগবানের সমান ঐশ্বর্য বা ক্ষমতা লাভ করা।
সামীপ্য: ভগবানের অত্যন্ত কাছে বা সান্নিধ্যে থাকার সৌভাগ্য লাভ করা।
৪. পুনর্জন্মের অবসান
হিন্দু শাস্ত্র মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের মনে কামনা-বাসনা অবশিষ্ট থাকে, ততক্ষণ তাকে বার বার জন্ম নিতে হয়।
জন্ম-মৃত্যুর চক্র (সংসার): মোক্ষ হলো এই চক্র থেকে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ।
দুঃখ নিবৃত্তি: ইহলোকের সমস্ত শারীরিক ও মানসিক কষ্ট (আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক তাপ) থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়া।
৫. মোক্ষ লাভের উপায় (সংক্ষেপে)
হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী মোক্ষ কেবল আলোচনার বিষয় নয়, এটি সাধনার বিষয়। এর জন্য প্রয়োজন:
চিত্তশুদ্ধি: মনকে পবিত্র করা।
ইন্দ্রিয় সংযম: কাম, ক্রোধ, লোভ ও মোহ থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
সদগুরুর আশ্রয়: যিনি সত্যের পথ প্রদর্শন করবেন।
উপসংহার: হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, মোক্ষ মানে কোনো শূন্যতা নয়, বরং এটি হলো পরমানন্দ। এটি এমন এক অবস্থা যেখানে কোনো ভয় নেই, মৃত্যু নেই এবং বিচ্ছেদ নেই—আছে শুধু অখণ্ড শান্তি ও পরমাত্মার সান্নিধ্য।


