মহাভারতের মহাকাব্যিক প্রেক্ষাপটে ধৃতরাষ্ট্রের পতন বা সবকিছু হারানোর মূলে কোনো একটি নির্দিষ্ট ভুল নয়, বরং বেশ কিছু চারিত্রিক দুর্বলতা এবং ভুল সিদ্ধান্তের সমষ্টি কাজ করেছিল। তবে প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. অন্ধ পুত্রস্নেহ (মোহ)
ধৃতরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল তার জ্যেষ্ঠ পুত্র দুর্যোধনের প্রতি সীমাহীন ও বিচারহীন মোহ। তিনি জানতেন দুর্যোধন অন্যায় পথে চলছেন, তবুও পিতৃস্নেহে অন্ধ হয়ে তিনি কখনোই কঠোরভাবে তাকে শাসন করেননি। পাণ্ডবদের প্রতি দুর্যোধনের অন্যায় আচরণগুলো তিনি নীরবে সমর্থন দিয়ে গেছেন।
২. অধর্মের প্রশ্রয়
মহাভারতে বলা হয়েছে, "যতো ধর্মস্ততো জয়ঃ" (যেখানে ধর্ম, সেখানেই জয়)। ধৃতরাষ্ট্র জানতেন যে পাণ্ডবরা ধর্মের পথে আছে এবং কৌরবরা অধর্ম করছে। শকুনি যখন দ্যুত ক্রীড়ায় (পাশা খেলা) পাণ্ডবদের ছলনা করে সর্বস্বান্ত করছিল, তখন ধৃতরাষ্ট্র কুরুসভার অভিভাবক হিসেবে তা থামাতে পারতেন। কিন্তু জয়ের লোভে তিনি নীরব ছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করে।
৩. সিদ্ধান্তহীনতা ও দুর্বল চিত্ত
ধৃতরাষ্ট্র অনেক সময় সঠিক-ভুলের পার্থক্য বুঝতেন। বিদুর বা ভীষ্ম যখন তাকে সুপরামর্শ দিতেন, তিনি তা গ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন, কিন্তু দুর্যোধন সামনে এসে জেদ ধরলেই তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে আসতেন। এই সিদ্ধান্তহীনতা এবং পুত্রের কাছে নতিস্বীকারই তার পতনের অন্যতম কারণ।
৪. সিংহাসনের প্রতি অতি আসক্তি
ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ হওয়ার কারণে রাজা হতে পারেননি (প্রথমে পাণ্ডু রাজা হয়েছিলেন)। এই না পাওয়ার ক্ষোভ তার মনে সিংহাসনের প্রতি এক গভীর লালসা তৈরি করেছিল। তিনি চেয়েছিলেন যেকোনো মূল্যে তার বংশই যেন হস্তিনাপুরের রাজদণ্ড ধরে রাখে। এই ক্ষমতার লোভ তাকে পাণ্ডবদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে প্ররোচিত করেছিল।
৫. দ্রৌপদীর অপমান
কুরুসভায় যখন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের চেষ্টা করা হয়, তখন ধৃতরাষ্ট্র সভার প্রধান হিসেবে নীরব ছিলেন। একজন নিরপরাধ নারীর এই চরম অপমানই কুরুবংশের ধ্বংসের বীজ বপন করেছিল। পরবর্তীতে তিনি ভয় পেয়ে পাণ্ডবদের সবকিছু ফিরিয়ে দিলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।
সংক্ষেপে: ধৃতরাষ্ট্রের পতনের মূল কারণ ছিল তার বিবেচনাহীন পুত্রস্নেহ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহসের অভাব। তার এই নীরবতাই শেষ পর্যন্ত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দাবানল সৃষ্টি করে, যাতে তিনি তার ১০০ পুত্রসহ সবকিছু হারান।


