👉সনাতন ধর্মে ব্রাহ্মণের যজ্ঞোপবীত বা পৈতা ধারণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। একটি পূর্ণাঙ্গ পৈতা সাধারণত ৯টি তন্তু বা সুতো দিয়ে তৈরি হয়, যা তিনটি প্রধান গুচ্ছে (পৈতার তিনটি প্রধান পাকানো সুতো) বিভক্ত থাকে।
এর গঠন ও তাৎপর্য নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. পৈতার গঠন (৩টি প্রধান সূত্র)
পৈতা মূলত তিনটি প্রধান সুতো দিয়ে তৈরি। এই তিনটি সূত্র মানুষের জীবনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঋণের প্রতীক:
পিতৃঋণ: পিতামাতা ও পূর্বপুরুষদের প্রতি কর্তব্য।
ঋষিঋণ: গুরু বা ঋষিদের থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা ও তা চর্চা করা।
দেবঋণ: সৃষ্টিকর্তা বা প্রকৃতির শক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।
আধ্যাত্মিক বিচারে এই তিনটি সুতো সত্ত্ব, রজ ও তম—এই তিন গুণেরও প্রতীক। একজন ব্রাহ্মণকে এই তিন গুণের ঊর্ধ্বে গিয়ে বা এদের নিয়ন্ত্রণ করে জীবন অতিবাহিত করতে হয়।
২. ৯টি তন্তু বা সুতোর তাৎপর্য
এই তিনটি প্রধান সূত্রের প্রতিটি আবার তিনটি করে চিকন তন্তু (Fiber) দিয়ে তৈরি। অর্থাৎ মোট ৩ × ৩ = ৯টি তন্তু থাকে। এই ৯টি তন্তু নয়জন দেবতার প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়: ১. ওঙ্কার (প্রণব) ২. অগ্নি ৩. সর্প (অনন্ত) ৪. সোম (চন্দ্র) ৫. পিতৃগণ ৬. প্রজাপতি (ব্রহ্মা) ৭. অনিল (বায়ু) ৮. যম ৯. বিশ্বদেবগণ
৩. ব্রহ্মগ্রন্থি (পৈতার গিট)
পৈতার শেষে যে বিশেষ গিট বা গ্রন্থি দেওয়া হয়, তাকে বলা হয় 'ব্রহ্মগ্রন্থি'। এটি সৃষ্টির তিন প্রধান শক্তির প্রতীক: ব্রহ্মা (সৃষ্টি), বিষ্ণু (স্থিতি) এবং শিব (লয়)। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে পরমব্রহ্ম এক এবং অদ্বিতীয়।
৪. গায়ত্রী মন্ত্রের সাথে সম্পর্ক
পৈতা ধারণের সময় গায়ত্রী মন্ত্র পাঠ করা হয়। এই সুতোগুলো গায়ত্রী ছন্দের চরণের সাথেও সম্পর্কিত। একজন পৈতাধারী ব্যক্তির প্রধান লক্ষ্য হলো ইন্দ্রিয় সংযম করা এবং ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করা।
ব্যবহারের নিয়ম ও তাৎপর্য
শৌচকর্মের সময়: মলমূত্র ত্যাগের সময় পৈতা ডান কানে রাখা হয়। এর বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা হলো, কানের পেছনের স্নায়ু উত্তেজিত হলে একাগ্রতা বাড়ে এবং শরীরের সূক্ষ্ম নাড়ীগুলো সুরক্ষিত থাকে।
অশৌচ: জন্ম বা মৃত্যুজনিত কারণে অশৌচ হলে পৈতা পরিবর্তন করার বিধান রয়েছে, যা আত্মশুদ্ধির প্রতীক।


