🙏🙏শ্রীমদ্ভাগবত এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন অনুসারে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের 'ষড়ৈশ্বর্যের' অন্যতম একটি প্রধান গুণ হলো 'বৈরাগ্য'। বৈরাগ্য মানে কেবল ত্যাগ নয়, বরং সবকিছুর অধিপতি হয়েও সেগুলোর প্রতি বিন্দুমাত্র আসক্তি না থাকা। শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণমাত্রায় বৈরাগ্যের প্রমাণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. রাজপদ ত্যাগ ও অনাসক্তি
শ্রীকৃষ্ণ মথুরার কংসকে নিধন করেছিলেন এবং দ্বারকার সমৃদ্ধি গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু তিনি নিজে কোনোদিন মথুরা বা দ্বারকার সিংহাসনে বসেননি। তিনি উগ্রসেনকে মথুরার রাজা করেন এবং নিজে কেবল একজন পরামর্শদাতা বা সারথি হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেন। অগাধ ক্ষমতার অধিকারী হয়েও ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করা তাঁর পূর্ণ বৈরাগ্যের নিদর্শন।
২. কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সারথি হওয়া
যিনি অখিল ব্রহ্মাণ্ডের পতি, তিনি অর্জুনের রথের চালক (সারথি) হতে দ্বিধা করেননি। একজন ভৃত্যের মতো ঘোড়ার যত্ন নেওয়া এবং রথ চালানো—এই নিরহংকার মনোভাব প্রমাণ করে যে তাঁর কাছে মান-সম্মান বা সামাজিক পদমর্যাদার কোনো পার্থিব আসক্তি ছিল না।
৩. যদু বংশের ধ্বংস ও দেহত্যাগ
শ্রীকৃষ্ণ জানতেন যে তাঁর নিজের বংশ (যদু বংশ) পারস্পরিক কলহে ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি চাইলেই তা রক্ষা করতে পারতেন, কিন্তু তিনি প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম এবং কর্মফলকে প্রাধান্য দিয়ে নির্বিকার ছিলেন। এমনকি নিজের দেহত্যাগের সময় (ব্যাধের শরের আঘাতে) তিনি সাধারণ মানুষের মতো বিলাপ না করে অত্যন্ত শান্ত ও বৈরাগ্যপূর্ণভাবে ধরাধাম ত্যাগ করেন।
৪. বৃন্দাবন ত্যাগ
শ্রীকৃষ্ণের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় স্থান ছিল বৃন্দাবন এবং প্রিয়জন ছিলেন গোপ-গোপীবৃন্দ। কিন্তু ধর্মের প্রয়োজনে এবং কংস নিধনের উদ্দেশ্যে তিনি যখন একবার বৃন্দাবন ত্যাগ করলেন, তখন আর কোনোদিন সেখানে ফিরে যাননি। প্রাণের চেয়েও প্রিয় মানুষদের ছেড়ে কর্তব্যকে প্রাধান্য দেওয়া তাঁর ত্যাগের এক চরম পরাকাষ্ঠা।
৫. গীতায় নিষ্কাম কর্মের শিক্ষা
যিনি নিজে পরম বৈরাগী, তিনিই কেবল অর্জুনকে বলতে পারেন—"কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন"। তিনি নিজে কর্ম করেছেন কিন্তু ফলের আশা করেননি। যুদ্ধের জয়-পরাজয় বা রাজ্য লাভের কোনো ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা তাঁর ছিল না; তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল ধর্ম সংস্থাপন।
সংক্ষেপে: শ্রীকৃষ্ণের বৈরাগ্য হলো 'যুক্ত বৈরাগ্য'। অর্থাৎ তিনি সংসারের সবকিছুর মধ্যে থেকেও পদ্মপাতার জলের মতো নির্লিপ্ত ছিলেন। ১৬,১০৮ জন মহিষী, অঢেল স্বর্ণালঙ্কার এবং দ্বারকার ঐশ্বর্যের মাঝে থেকেও তিনি ছিলেন আত্মলীন এবং কামনাহীন।


