সনাতন ধর্মে শ্রীকৃষ্ণকে কেবল একজন অবতার বা মহাপুরুষ হিসেবে নয়, বরং 'স্বয়ং ভগবান' বা পরমেশ্বর হিসেবে গণ্য করা হয়। এর পেছনে শাস্ত্রীয়, দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক অনেকগুলো গভীর কারণ রয়েছে। শ্রীমদ্ভাগবত এবং ভগবদ্গীতার আলোকে এর প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো —
১. ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ (সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক)
'ব্রহ্মসংহিতা'র একটি বিখ্যাত শ্লোকে বলা হয়েছে —
ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ।
অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম্।।
এর অর্থ হলো — কৃষ্ণই পরম ঈশ্বর, তাঁর দেহ সচ্চিদানন্দময় (সৎ, চিৎ ও আনন্দ)। তাঁর কোনো আদি নেই, অথচ তিনি সব কিছুর আদি এবং সমস্ত কারণের মূল কারণ। অন্যান্য দেব-দেবী বা অবতারগণ তাঁরই বিভিন্ন অংশ বা কলা থেকে উদ্ভূত।
২. কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ম্
শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম স্কন্ধের তৃতীয় অধ্যায়ে বিভিন্ন অবতারের তালিকা দেওয়ার পর ঋষি সূত গোস্বামী স্পষ্ট করে বলেছেন —
এতে চাংশকলাঃ পুংসঃ কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ম্
অর্থাৎ, অন্যান্য অবতারগণ ভগবানের অংশ বা কলামাত্র, কিন্তু কৃষ্ণ হচ্ছেন স্বয়ং পূর্ণ ভগবান।
৩. ষড়-ঐশ্বর্যের পূর্ণ প্রকাশ
শাস্ত্রমতে, 'ভগবান' শব্দের অর্থ হলো যাঁর মধ্যে পূর্ণ মাত্রায় ছয়টি ঐশ্বর্য বিদ্যমান। শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে এই ছয়টি গুণের পূর্ণতম বিকাশ দেখা যায়:
ঐশ্বর্য: অলৌকিক শক্তি ও বিভূতি।
বীর্য: অসীম বিক্রম বা শক্তি।
যশ: বিশ্বজুড়ে তাঁর খ্যাতি।
শ্রী: পরম সৌন্দর্য (কৃষ্ণ শব্দের অর্থই হলো—যিনি সবাইকে আকর্ষণ করেন)।
জ্ঞান: মহাবিশ্বের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান।
বৈরাগ্য: সব কিছু সৃষ্টি করেও তাতে নির্লিপ্ত থাকার ক্ষমতা।
৪. পরম পুরুষোত্তম এবং গীতার বাণী
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় কৃষ্ণ নিজেই অর্জুনকে বলেছেন —
মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয়
অর্থাৎ: হে অর্জুন, আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কেউ বা কিছু নেই।
অর্জুন যখন কৃষ্ণের 'বিশ্বরূপ' দর্শন করেন, তখন প্রমাণিত হয় যে সমগ্র চরাচর, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব এবং সমস্ত দেব-দেবী তাঁরই মধ্যে অবস্থান করছেন।
৫. লীলার মাধুর্য ও বৈচিত্র্য
অন্যান্য অবতারদের মধ্যে সাধারণত একটি বিশেষ ভাব বা গুণের প্রাধান্য থাকে (যেমন—শ্রীরামচন্দ্রের আদর্শ পুরুষ ভাব)। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে জীবনের সব ভাবের পূর্ণতা পাওয়া যায়। তিনি একই সাথে আদর্শ সন্তান, সখা, প্রেমিক, শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা, ধূর্ত রাজনীতিক এবং পরম গুরু। তাঁর বাল্যলীলা, বৃন্দাবনলীলা এবং কুরুক্ষেত্রের রণক্ষেত্রে দেওয়া জ্ঞান (গীতা) তাঁকে অন্য সবার থেকে স্বতন্ত্র ও পরমেশ্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর বলা হয় কারণ তিনি সব কিছুর উৎস, তিনি অনাদি, অনন্ত এবং তাঁর মধ্যেই সমস্ত সৃষ্টির লয় ও উদয় ঘটে। তিনি কেবল ধর্মের রক্ষাকারী নন, তিনি নিজেই ধর্মের এবং সত্যের চরম গন্তব্য।


