'গুরুদশা' মূলত সনাতন শাস্ত্রীয় ও বৈদিক আচার-প্রথার একটি বিশেষ সময়কাল, যা পিতামাতা বা পরিবারের কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ পূজনীয় ব্যক্তির মৃত্যুর পর পালন করা হয়।
সহজ কথায়, পিতামাতা বা গুরুজনের মৃত্যুর পর সন্তান বা অধস্তনদের যে নির্দিষ্ট সময় অশৌচ (আশৌচ) ও কঠোর সংযম পালন করতে হয়, তাকেই সাধারণ ভাষায় 'গুরুদশা' বলা হয়।
নিচে গুরুদশার মূল বিষয়গুলো সহজভাবে আলোচনা করা হলো —
১. 'গুরুদশা' নামটির তাৎপর্য
এখানে 'গুরু' শব্দের অর্থ হলো পূজনীয় বা শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি (যেমন: পিতা, মাতা বা দীক্ষাগুরু) এবং 'দশা' শব্দের অর্থ হলো অবস্থা বা নির্দিষ্ট সময়কাল। যিনি আজীবন পরম স্নেহ ও রক্ষাকর্তা হিসেবে মাথার ওপর ছাতা হয়ে ছিলেন, তাঁর বিয়োগে সন্তান যে শোকাচ্ছন্ন ও সংযমী অবস্থার মধ্য দিয়ে যায়, সেটাই গুরুদশা।
২. গুরুদশায় কী কী পালন করা হয়?
গুরুদশা বা অশৌচ পালনের প্রধান লক্ষ্য হলো কঠোর আত্মসংযম, পবিত্রতা রক্ষা এবং প্রয়াত আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। এই সময়ে শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী কিছু বিশেষ বিধি মেনে চলা হয় —
আহারের সংযম: এই সময়ে সাধারণ খাদ্য গ্রহণ করা নিষেধ। সাধারণত কেবল মাত্র একবেলা আলো চালের ভাত, ঘি ও সামান্য সবজি সিদ্ধ (যাকে 'হবিষ্যান্ন' বা 'হবিষ্য' বলা হয়) গ্রহণ করা হয়। কোনো প্রকার আমিষ, মসলাযুক্ত খাবার বা বাইরের খাবার খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে।
বেশভূষা ও শয্যা: বিলাসী বসন ত্যাগ করে সাদা বা সেলাইহীন বস্ত্র (ধুতি/থান) পরিধান করা হয়। কোনো আরামদায়ক বিছানায় না শুয়ে মেঝেতে কম্বল বা মাদুর পেতে ঘুমানোর নিয়ম।
সামাজিক নিসঙ্গতা ও প্রসাধন ত্যাগ: তেল, সাবান, সুগন্ধি ব্যবহার করা, চুল বা নখ কাটা নিষিদ্ধ থাকে। কোনো প্রকার আনন্দ উৎসব বা শুভ কাজে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হয়। * আত্মার উদ্দেশ্যে তর্পণ: প্রতিদিন প্রয়াত পিতামাতার আত্মার উদ্দেশ্যে তিল ও জল দিয়ে তর্পণ করা হয় এবং নির্দিষ্ট দিনে শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান সম্পন্ন করা হয়।
৩. সময়কাল
শাস্ত্র ও সামাজিক রীতি অনুযায়ী বিভিন্ন বর্ণের ও অঞ্চলের ক্ষেত্রে অশৌচ বা গুরুদশার সময়সীমায় কিছু তারতম্য দেখা যায়। সাধারণত পিতা বা মাতার মৃত্যুর পর এটি ১০ দিন, ১২ দিন, ১৫ দিন বা ৩০ দিন পর্যন্ত পালন করা হয়। অশৌচ কাল শেষে মস্তক মুণ্ডন (চাপ দেওয়া), নখ কাটা, স্নান করে পবিত্র হওয়া এবং 'শ্রাদ্ধানুষ্ঠান' সম্পন্ন করার মাধ্যমে এই গুরুদশার সমাপ্তি ঘটে।
৪. গুরুদশার অন্তর্দৃষ্টি ও উদ্দেশ্য
এর পেছনে কেবল অন্ধ সংস্কার নয়, গভীর মানসিক ও স্বাস্থ্যগত কারণ রয়েছে —
মানসিক প্রস্তুতি: হঠাৎ প্রিয়জনকে হারানোর পর শোক সামলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য এই সময়টি মানুষকে মানসিকভাবে স্থির হতে সাহায্য করে।
কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা: যে পিতা-মাতা আমাদের জন্ম ও লালন-পালন করেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর এবং তাঁদের আত্মার সদ্গতির জন্য প্রার্থনা করার এটি পরম ক্ষেত্র।
দেহ ও মনের শুদ্ধি: কঠোর সংযম ও নিরামিষ/হবিষ্যান্ন আহারের মাধ্যমে সন্তানের শরীর ও মনকে বিশুদ্ধ করা হয়, যাতে তারা শ্রদ্ধার সাথে শ্রাদ্ধ ও উৎসর্গের দায়িত্ব পালন করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, পিতামাতার দেহত্যাগের পর তাঁদের আত্মার সদ্গতি এবং নিজের দেহ-মনের পবিত্রীকরণের উদ্দেশ্যে যে নির্দিষ্ট কিছুদিন কঠোর ত্যাগ, নিয়ম ও সংযম পালন করা হয়, তাকেই গুরুদশা বা অশৌচকাল বলা হয়।


