কর্মযোগ ও জ্ঞানযোগের মধ্যে কোনটি শ্রেয়?
1 answers
18 views
Uzzwal Dhali
+1
Answer
Login

আরও পড়ুন ...

1 Answer

কর্মযোগ ও জ্ঞানযোগের মধ্যে কোনটি শ্রেয়? (৩/১-২)◼️

****শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – তৃতীয় অধ্যায় – কর্মযোগ*****

|অর্জুন উবাচ |

❝ জ্যায়সী চেৎ কর্মণস্তে মতা বুদ্ধিঃ-জনার্দন।
তৎ কিং কর্মণি ঘোরে মাং নিয়োজয়সি কেশব ॥১॥
ব্যামিশ্রেণেব বাক্যেন বুদ্ধিং মোহয়সী-ইব মে।
তৎ-একং বদ নিশ্চিত্য যেন শ্রেয়ঃ-অহম্‌-আপ্নুয়াম্ ॥২॥❞

━┉┈┈(ভগবদ্গী‌তা, ৩/১-২)

অনুবাদ: “অজুর্ন বললেন হে জনার্দন! হে কেশব! যদি তোমার মতে সকাম কর্ম অপেক্ষা জ্ঞান শ্রেষ্ঠ হয়, তবে আমাকে এই হিসাংত্মক কর্মে (যুদ্ধে) কেন নিযুক্ত করছেন? ॥ ১ ॥

তোমার দ্ব্যর্থবোধক বাক্যের দ্বারা আমার মন বিভ্রান্ত হচ্ছে। তাই দয়া করে আমাকে নিশ্চিতভাবে বল কোনটি আমার পক্ষে শ্রেয়ষ্কর (কল্যাণকারী)? ॥ ২ ॥

|শ্রীভগবানুবাচ|

❝ লোকেহস্মিন দ্বিবিধা নিষ্ঠা পুরা প্রোক্তা ময়া-অনঘ।
জ্ঞানযোগেন সাংখ্যানাম্ কর্মযোগেন যোগিনাম্‌ ॥ ৩ ॥ ❞

অনুবাদ: “পরমেশ্বর শ্রীভগবান বললেন ━ হে নিষ্পাপ অর্জুন! এই জগতে দুই প্রকার মোক্ষলাভের পথ আমি পূর্বে নির্দেশ করেছি-জ্ঞানাধিকারীদের জন্য জ্ঞানযোগ এবং কর্মযোগীদের জন্য কর্মযোগ।

❝ ন কর্মণাম্‌-অনারম্ভাৎ নৈষ্কর্ম্যং পুরুষঃ-অশ্নুতে ।
ন চ সন্ন্যসনাৎ-এব সিদ্ধিং সমধিগচ্ছতি ॥ ৪ ॥ ❞

অনুবাদ: “কেবল কর্মের অনুষ্ঠান না করার মাধ্যমে কর্মফল থেকে মুক্ত হওয়া যায় না, আবার কর্মত্যাগের মাধ্যমেও সিদ্ধি লাভ করা যায় না।

❝ ন হি কশ্চিৎ ক্ষণম্‌-অপি জাতু তিষ্ঠত্যকর্মকৃৎ।
কার্যতে হি-অবশঃ কর্ম সর্বঃ প্রকৃতিজৈর্গুণৈঃ ॥ ৫ ॥ ❞

অনুবাদ: “কেউ কখনও ক্ষণকালের জন্যও কর্ম না করে থাকতে পারে না। প্রাকৃতজাত গুণের (সত্ত্ব, তম, রজ: এই তিনটি গুণের) প্রভাবেই মানুষ কর্ম করতে বাধ্য হয়। তম ও রজ: গুণের কারণে মানুষের মধ্যে রাগ, দ্বেষ প্রভৃতি উৎপন্ন হয়। এই তিন গুণের বশবতী হয়েই মানুষ কর্মে ব্রতী হয়।

❝ কর্মেন্দ্রিয়াণি সংযম্য যঃ আস্তে মনসা স্মরন্‌ ।
ইন্দ্রিয়ার্থান্ বিমূঢ়-আত্মা মিথ্যাচারঃ সঃ উচ্যতে ॥ ৬ ॥ ❞

অনুবাদ: “যে মূঢ় ব্যক্তি পঞ্চ-কর্মেন্দ্রিয় সংযত করেও মনে মনে শব্দ, রস আদি ইন্দ্রিয় বিষয়গুলি স্মরণ করতে থাকে, সেই মূঢ় অবশ্যই নিজেকে বিভ্রান্ত করে এবং লোকে তাকে মিথ্যাচারী ভণ্ড বলে।

❝ যস্ত্ব-ইন্দ্রিয়াণি মনসা নিয়ম্য-আরভতে-অর্জুন।
কর্মেন্দ্রিয়ৈঃ কর্মযোগম্‌-অসক্তঃ সঃ বিশিষ্যতে ॥ ৭ ॥ ❞

অনুবাদ: “যিনি বিবেকযুক্ত মনের দ্বারা চক্ষু, কর্ণ প্রভৃতি জ্ঞানেন্দ্রিয় সংযত করেন এবং অনাসক্তভাবে কর্মেন্দ্রিয় দ্বারা কর্মানুষ্ঠান করেন, তিনি পূর্বোক্ত মিথ্যাচারী অপেক্ষা অনেক গুণে শ্রেষ্ঠ।

❝ নিয়তং কুরু কর্ম ত্বং কর্ম জ্যায়ো হি-অকর্মণঃ।
শরীরযাত্রা-অপি চ তে ন প্রসিদ্ধ্যেৎ-অকর্মণঃ ॥ ৮ ॥ ❞

অনুবাদ: “তুমি শাস্ত্রবিহিত নিত্য কর্ম কর। কর্ম না করা অপেক্ষা কর্ম করাই শ্রেয়। কর্মহীন হলে তোমার দেহযাত্রাও নির্বাহ হবে না।

❝ যজ্ঞার্থাৎ কর্মণঃ-অন্যত্র লোকঃ-অয়ম্‌ কর্মবন্ধনঃ।
তদর্থং কর্ম কৌন্তেয় মুক্তসঙ্গঃ সমাচর ॥ ৯ ॥ ❞

অনুবাদ: “ঈশ্বরের প্রীতির জন্য কর্ম করা উচিত; তা না হলে কর্মই এই জড় জগতে বন্ধনের কারণ। তাই, হে কৌন্তেয়! ঈশ্বরের সন্তুষ্টি বিধানের জন্যই কেবল তুমি অনাসক্ত হয়ে শাস্ত্রসম্মতভাবে তোমার কর্তব্যকর্ম অনুষ্ঠান কর এবং এভাবেই তুমি সর্বদাই বন্ধন থেকে মুক্ত থাকতে পারবে।

❝ এবং প্রবর্তিতং চক্রং ন-অনুবর্তয়তি-ইহ যঃ।
অঘায়ুঃ ইন্দ্রিয়ারামঃ মোঘং পার্থ সঃ জীবতি॥ ১৬ ॥ ❞

অনুবাদ: “হে অর্জুন! যে ব্যক্তি এই জীবনে বেদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত যজ্ঞ অনুষ্ঠানের পন্থা অনুসরণ করে না, সেই ইন্দ্রিয়সুখ-পরায়ণ পাপী ব্যক্তি বৃথা জীবন ধারণ করে।

❝ যঃ-তু-আত্মরতিঃ-এব স্যাৎ-আত্মতৃপ্তশ্চ মানবঃ।
আত্মনি-এব চ সন্তুষ্টঃ-তস্য কার্যং ন বিদ্যতে॥ ১৭ ॥ ❞

অনুবাদ: “কিন্তু যে ব্যক্তি আত্মাতেই প্রীত, আত্মাতেই তৃপ্ত এবং আত্মাতেই সন্তুষ্ট, তাঁরা কোন কর্তব্যকর্ম নেই।

অর্থাৎ যিনি সম্পূর্ণভাবে কৃষ্ণভাবনাময় এবং কৃষ্ণসেবায় যিনি সম্পূর্ণভাবে মগ্ন, তাঁর অন্য কোন কর্তব্য নেই। কৃষ্ণভক্তি লাভ করার ফলে তাঁর অন্তর সম্পূর্ণভাবে কলুষমুক্ত হয়ে পবিত্র হয়। তিনি আত্মজ্ঞানী। হাজার হাজার যজ্ঞ অনুষ্ঠানেও যে ফল লাভ করা যায় না, কৃষ্ণভক্তির প্রভাবে তা মুহূর্তের মধ্যে সাধিত হয়। এভাবে চেতনা শুদ্ধ হলে জীব পরমেশ্বরের সঙ্গে তাঁর নিত্যকালের সম্পর্ক উপলব্ধিই করতে পারেন। তিনি আর বৈদিক নির্দেশ অনুসারে কর্তব্য-অকর্তব্যের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকেন না। তার আর জড় বিষয়াসক্তি থাকে না এবং কামিনী-কাঞ্চনের প্রতি তাঁর আর কোন মােহ থাকে না। 

❝ নৈব তস্য কৃতেন-অর্থঃ ন-অকৃতেন-ইহ কশ্চন।
ন চ-অস্য সর্বভূতেষু কশ্চিৎ-অর্থ-ব্যপাশ্রয়ঃ॥ ১৮ ॥ ❞

অনুবাদ: “আত্মানন্দ অনুভবকারী ব্যক্তির এই জগতে ধর্ম অনুষ্ঠানের কোন প্রয়োজন নেই এবং কর্ম থেকে বিরত থাকারও কোনো প্রয়োজন নেই। তাকে অন্য কোন প্রাণীর (দেব-দেবীর) উপর নির্ভর করতেও হয় না।

অর্থাৎ যে মানুষ ভগবানের স্বরূপ উপলব্ধি করেছেন তিনি অবশ্যই জানতে পেরেছেন যে, তিনি হলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্যদাস, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করাই হল তার এক ও একমাত্র কর্তব্যকর্ম। তবে কৃষ্ণভক্তি এতো সহজ নয়, কৃষ্ণভক্তি মানে সজ্ঞানে-অজ্ঞানে- শয়নে-স্বপনে কৃষ্ণ নাম করা, কৃষ্ণসেবা করা, শ্রীকৃষ্ণের দাসত্ব করা, তাই কৃষ্ণভক্তেরা এক মুহূর্তের জন্য সময় নষ্ট হতে দেন না। তাই তো ভগবান আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন, নিষ্কর্মা, অলস, আসুরিক ভাবাপন্ন মানুষ কৃষ্ণভক্তি করতে পারে না। ভগবানের নির্দেশে কৃষ্ণভক্তেরা বুঝে গিয়েছে, ভগবানের সেবা করার অর্থই হল সকল দেব-দেবীর সেবা করা, আলাদা করে দেব-দেবীর পূজা করার প্রয়োজন নেই।

❝ তস্মাৎ অসক্তঃ সততং কার্যং কর্ম সমাচর।
অসক্তো হি আচরন্ কর্ম পরম্ আপ্নোতি পুরুষঃ॥ ১৯ ॥ ❞

অনুবাদ: “অতএব, কর্মফলের প্রতি আসক্তি রহিত হয়ে কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করো৷ অনাসক্ত হয়ে কর্ম করার ফলেই মানুষ পরতত্ত্বকে লাভ করতে পারে।

❝ কর্মণা-এব হি সংসিদ্ধিম্-আস্থিতাঃ জনকাদয়ঃ।
লোকসংগ্রহম্-এব-অপি সংপশ্যন্ কর্তুম্-অর্হসি ॥২০॥ ❞

অনুবাদ: “জনক আদি রাজারাও কর্ম দ্বারাই সংসিদ্ধি (সফলতা) প্রাপ্ত হয়েছিলেন ৷ অতএব, জনসাধারণকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তোমার কর্ম করা উচিত।

❝ যৎ যৎ-আচরতি শ্রেষ্ঠঃ তৎ তৎ-এব-ইতরঃ জনঃ।
স যৎ প্রমাণং কুরুতে লোকঃ-তৎ-অনুবর্ততে ॥২১॥ ❞

অনুবাদ: “শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যেভাবে আচরণ করেন, সাধারণ মানুষেরা তার অনুকরণ করে। তিনি যা প্রমাণ বলে স্বীকার করেন, সমগ্র পৃথিবী তারেই অনুসরণ করে।

❝ ন মে পার্থাস্তি কর্তব্যং ত্রিষু লোকেষু কিঞ্চন।
ন-অনবাপ্তম্‌-অবাপ্তব্যম্‌ বর্ত এব চ কর্মণি ॥২২॥ ❞

অনুবাদ: “হে পার্থ! এই ত্রিজগতে আমার কিছুই কর্তব্য নেই। আমার অপ্রাপ্ত কিছু নেই এবং প্রাপ্তব্যও কিছু নেই। তবুও আমি কর্মে ব্যাপৃত আছি।

❝ যদি হি-অহম্ ন বর্তেয়ং জাতু কর্মণি-অতন্দ্রিতঃ।
মম বর্ত্ম-অনুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ॥২৩॥ ❞

অনুবাদ: “হে পার্থ! আমি যদি অনলস হয়ে কর্তব্যকর্মে প্রবৃত্ত না হই, তবে আমার অনুবর্তী হয়ে সমস্ত মানুষই কর্ম ত্যাগ করবে।

Uzzwal Dhali
+1