শ্রীল প্রভুপাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী..
শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা -আচার্য যিনি শ্রীল প্রভুপাদ নামে পরিচিত সেই ওঁ বিষ্ণুপাদ পরমহংস পরিব্রাজকাচার্য নিত্যলীলাপ্রবিষ্ট অষ্টোত্তরশত শ্রী এ.সি ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের চরণে আমরা আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করছি । তাঁর সম্পূর্ণ জীবন কাহিনী শ্রীমৎ সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী কর্তৃক রচিত প্রভুপাদ লীলামৃত সাতটি খন্ডে পাওয়া যায়। যেখানে তাঁর জীবন কাহিনীর বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। ১৮৯৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর অভয়চরণ দে নামে শ্রীল প্রভুপাদ ভারতভূমির কলকাতায় আবির্ভূত হন। তাঁর পিতা গৌরমোহন দে একজন কাপড়ের ব্যবসায়ী ছিলেন এবং মাতার নাম ছিল রজনী দেবী। বাঙ্গালী ঐতিহ্য অনুসারে তাঁর পিতা-মাতা একজন জ্যোতিষীকে দিয়ে শিশুপুত্রের ঠিকুজি করিয়েছিলেন এবং শিশুটির শুভ লক্ষণযুক্ত ভবিষ্যৎ কার্যকলাপের কথা যখন পাঠ করা হচ্ছিল, তখন তাঁরা সকলেই উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলেন। সেই জ্যোতিষ একটি বিশেষ ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন-‘‘শিশুটির বয়স যখন ৭০ বছর হবে, তখন তিনি সাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশে যাবেন, এক বিখ্যাত ধর্মপ্রচারকরূপে স্বীকৃতি লাভ করবেন ও ১০৮টি মন্দির প্রতিষ্ঠা করবেন। (সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী, ১৯৮৭, ‘তোমার সর্বদা শুভাকাক্ষী’,পৃষ্ঠা নং-১০)। এটা উল্লেখযোগ্য যে, ১৮৯৬ সাল ঐ একই বছরে কানাডার এমসি. গিল ইউনিভার্সিটিতে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের বই স্বীকৃত হয়, যা ছিল পাশ্চাত্যে প্রচারের প্রথম দিক নিদর্শন। ছোট্ট অভয় যখন স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করতেন, তাঁর পিতা এতে কৌতুক অনুভব করতেন এবং তাঁর প্রতি সর্বদা কৃপালু ও ক্ষমাশীল আচরণ করতেন। কিন্তু তাঁর মাতা প্রতিদিন অভয়ের সাথে স্কুলে যাওয়ার জন্য একজন প্রহরী নিয়োগ করেছিলেন। গৌরমোহন দে ছিলেন একজন শুদ্ধ বৈষ্ণব এবং তিনি প্রায়ই ছোট্ট অভয়কে স্থানীয় রাধা-গোবিন্দ মন্দিরে নিয়ে যেতেন। সেখানে ছোট্ট অভয়কে অনেক ঘণ্টা বিগ্রহের সম্মুখে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতে দেখা যেত। ‘‘বাঁকা বিহারীর বিগ্রহ ছিল খুবই সুন্দর’’। (এ.সি ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ, সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী, ১৯৮৭, ‘শুভাকাক্ষী’, পৃষ্ঠা নং-১৩)। অভয় যতই বড় হচ্ছিলেন, ততই ভগবানের বিগ্রহের প্রতি ভক্তিপরায়ণ হচ্ছিলেন। প্রতিবছর কোলকাতায় জগন্নাথদেবের রথযাত্রা মহোৎসব দেখে তিনি গভীরভাবে অভিভূত হতেন। উৎসবের তাৎপর্য শোনা এবং বোঝার পর, অভয় মাঝে মাঝে রেলওয়ে টাইমটেবিল দেখতেন জগন্নাথপুরী যাওয়ার জন্য, যেখানে শ্রীচৈতন্যদেব স্বয়ং ৫০০ বছর পূর্বে যোগদান করেছিলেন। সমীক্ষা অনুযায়ী , এই উৎসবে প্রতিবছর প্রায় ৫ লক্ষ লোক সমাগম ঘটে, যা অভয়কে আরও বেশি রথযাত্রার চিন্তায় নিমগ্ন করত। ১৯০১ সাল নাগাদ ছোট্ট অভয়, তাঁর প্রথম রথযাত্রা সম্পন্ন করেন। তাঁর পিতা তাঁকে তিন ফুট উঁচু একটি ছোট রথ বানিয়ে দেন, সেটি যেন ঠিক পুরীর রথেরই একটি ছোট সংস্করণ হয়েছিল। সকল স্থানীয় বাচ্চারা এবং অনেক বয়স্করাও আসত। তখন থেকেই অভয় একজন নেতার মত আচরণ করতেন, যেহেতু তিনি সবাইকে এমনকি মাতাজীদেরও রান্নার কাজে নিয়োজিত করতেন (বিশেষ করে তাঁর বোন ভবতারিণী), যিনি সকল বিশেষ পদ রান্না করতেন, তারপর ভগবানকে নিবেদন করে মহাপ্রসাদ হিসাবে বিতরণ করতেন। ৬ বছর বয়সে অভয়ের অনুরোধে, তাঁর পিতা তাঁকে নিজস্ব রাধা-গোবিন্দ বিগ্রহ কিনে দেন। এটা ছিল স্বাভাবিক, কারণ ছোটবেলা থেকেই তিনি তাঁর পিতাকে বাড়িতে পূজা করতে দেখেছিলেন আর নিয়মিতভাবে রাধা-গোবিন্দের মন্দিরে পূজা দর্শন করেছিলেন। ঐদিন থেকে, তাঁর পিতামাতা যেকোনো খাবার তাঁকে এনে দিতেন, সেগুলো তিনি সর্বপ্রথম রাধা-গোবিন্দজীকে নিবেদন করতেন এবং তারপর তাঁদের প্রসাদ গ্রহণ করতেন। এছাড়াও তিনি প্রতিদিন ধূপ-দীপ সহকারে সেই শ্রীবিগ্রহের আরতি করতেন এবং রাত্রিবেলা তাঁদের শয়ন করাতেন, যতটুকু ঐ বয়সে তিনি বুঝতেন। কলেজে পড়বার সময়ে, তাঁর পিতা রাধারাণী দত্তের সঙ্গে তাঁর বিবাহের আয়োজন করেন। ১৯১৮ সালে তাঁদের বিবাহ হয় কিন্তু বিবাহের পর বেশ কয়েক বৎসর অভয় তাঁর বাড়িতেই ছিলেন এবং রাধারাণী তার বাপের বাড়িতে ছিলেন যেহেতু রাধারাণীর বয়স ছিল মাত্র ১১ বৎসর এবং অভয়ের বয়স ছিল ২২ বৎসর। এছাড়াও বেশ কিছু কারণে এটা তাঁর কলেজের শিক্ষা সমাপ্তির ক্ষেত্রে সুবিধাজনক ছিল। আর এটা প্রচলিত ছিল যে, পরিবার প্রতিপালনের দায়িত্ব হল চ্যালেঞ্জ। কলেজের চতুর্থ বর্ষে থাকাকালীন সময়ে, অভয় ডিগ্রী গ্রহণে অনীহা অনুভব করছিলেন যেহেতু বৃটিশরা সেই ডিগ্রী প্রদান করছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর সহানুভূতি বৃদ্ধি পাচ্ছিল; এটা স্বদেশী শিক্ষা ব্যবস্থা, বৃটিশদের নীতি থেকে মুক্তি এবং নিজস্ব সরকার এসবে অনুপ্রাণিত করেছিল। ঐ একই কলেজে (স্কটিশ চার্চ কলেজ) অভয়চরণের চেয়ে এক ক্লাম উঁচুতে ছিলেন অত্যন্ত তেজস্বী এক জাতীয়তাবাদী পুরুষ সুভাষ চন্দ্র বসু, যিনি পরবর্তীকালে ভারতবর্ষকে ইংরেজ শাসকের কবলমুক্ত করার জন্য ভারতীয় জাতীয় আর্মি গঠন করেছিলেন। অভয় বিশেষভাবে মোহনচাঁদ করম চাঁদ গান্ধীর (মহাত্মা গান্ধী) সুন্দর ও সাধারণ শিক্ষার দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন। যিনি পুরনো ভারতীয় সংস্কৃতির মূলনীতির দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এবং অন্যান্য গ্রন্থের তুলনায় ভগবদ্গীতা গ্রন্থের দ্বারা প্রভাবিত হয়েই তিনি কথা বলতেন। তার ব্যক্তিগত অভ্যাস এবং জীবনাচরণ ছিল শুদ্ধ, যেহেতু তিনি একজন সাধুর মত সরল জীবনযাপন করতেন এবং অভয়ের দেখা বহু সাধুদের তুলনায় গান্ধীজীর একনিষ্ঠতা ছিল অনেক বেশি। গান্ধীজী ভারতীয় ছাত্রদের রাষ্টদ্রোহ করতে আহবান করেছিলেন এবং বৃটিশ ধ্যান ধারণা, প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা যেটা সর্বোপরি একজনকে বৃটিশ রাজত্বের দাসে পরিণত করে এবং ভারতীয়দের স্বদেশী মুক্তি, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং অক্ষুণ্ণতা অটুট রাখতে বাধা সৃষ্টি করে তা ত্যাগ করতে বলেন। ঐসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে গঠিত ছিল যে, ছাত্রদের কঠোরভাবে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের ধারণা দিত এবং তাদেরকে পাশ্চাত্যের ভাবধারা এবং পৃষ্ঠপোষকতায় অনুপ্রাণিত খ্রিস্টীয় চার্চ দ্বারা বিকৃত দার্শনিকতা শিক্ষা দেওয়া হত যাতে করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অভয় সবদিক সতর্কভাবে বিবেচনা করলেন এবং তারপর কলেজের চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষা পাশ করার পরও তাঁর প্রাপ্য ডিগ্রী নিতে অস্বীকৃতি জানালেন। সুতরাং এর মাধ্যমে তিনি গান্ধীজীর ডাকে সাড়া দিয়ে প্রতিবাদ জানালেন। জালিয়ানওয়ালাবাগে এক শান্তিপূর্ণ জনসভায় শত শত নিরস্ত্র ভারতবাসীকে ইংরেজ সৈন্যরা নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল, তখন গান্ধীজী সম্পূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন এবং ইংরেজদের সবকিছু বর্জনের জন্যে দেশবাসীর প্রতি আহবান জানান, তখন থেকেই অভয় গান্ধীজীর স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে নিজেকে জড়িয়েছিলেন। অভয়ের পিতা পুত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তিত হলেও, তিনি কখনও তাঁর মতামতে বিরক্তি প্রকাশ করেননি। ভারতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ এর চেয়ে পুত্রের ভবিষ্যৎ বিষয়ে অধিক চিন্তিত হয়ে পিতা গৌরমোহন দে, তাঁর একজন ঘনিষ্ট হিতাকাক্ষী শৈল্য চিকিৎসক ও ক্যামিস্ট কার্তিক চন্দ্র বসুর সহায়তায় তাঁর জন্য একটা ভাল চাকরির ব্যবস্থা করেন। ডা. বসু আনন্দের সঙ্গে অভয়কে তার বিভাগীয় প্রধান রূপে অভিষিক্ত করেন। ১৯২১ সালে তাঁর পত্নী ১৪ বছর বয়সে তাঁদের প্রথম পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। (এ.সি ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ, ৮ জুন ১৯৭৪, আলোচনা প্রাতভ্রমণ, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড)। ১৯২২ সালে তাঁর গুরুমহারাজের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎকারের কথা সারা জীবন ধরেই অভয় স্মরণ করতেন। অভয়চরণের কিছু বন্ধু একজন সাধুকে দেখতে যাচ্ছিল, যিনি কোলকাতায় প্রবচন প্রদান করছিলেন এবং তিনি ছিলেন ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের বংশধর, ব্রহ্ম মাধ্ব গৌড়ীয় সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত এমনকি তাঁর পিতাও গিয়েছিলেন এবং তাঁর স্কটিশ চার্চ কলেজের শিক্ষিত এবং মর্যাদাসম্পন্ন নেতা বন্ধুরাও গিয়েছিল কিন্তু অভয় সাক্ষাৎ করতে যাননি। পরিবারে থেকেই অভয় অনেক তথাকথিত সাধুদের দেখেছিলেন, তাঁর পিতা শুদ্ধভক্ত হওয়ার দরুণ, প্রসাদ পাওয়ার জন্য তাদের বাড়িতে প্রায়ই সাধুদের নিমন্ত্রণ করতেন, কিন্তু অভয়চরণ তাদের দ্বারা তেমন প্রভাবিত হতেন না। অভয়ের বন্ধুরা তাঁর ভক্তি ও জ্ঞান সম্পর্কে অবগত ছিল এবং তাঁর মতামতের কদর করত এজন্যই ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল। যদিও অভয়ের ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু তার একজন বন্ধুর অনুরোধে তিনি যেতে রাজি হলেন। তাঁরা যখন সেই সন্ন্যাসীকে প্রণতি নিবেদন করে উঠে বসতে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি কোন রকম ভূমিকার অবতারণা না করেই তাঁদের বললেন, ‘‘তোমরা শিক্ষিত যুবক। তোমরা কেন সারা পৃথিবী জুড়ে চৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী প্রচার করছ না ? (সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী, ১৯৮৭, ‘তোমার সর্বদা শুভাকাক্ষী’, পৃষ্ঠা নং-১৬) অভয়চরণ খুব বিস্মিত হয়েছিলেন যে, ঐ সাধু অতিসত্বরই তাঁদের তাঁর নিজের পক্ষের প্রচারক হতে বলছেন। ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, তিনি কয়েকটি বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্নের দ্বারা তাঁর পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন। (সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী, ১৯৮৭, ‘তোমার সর্বদা শুভাকাক্ষী’, পৃষ্ঠা নং-১৬) খদ্দরের ধূতি পরিহিত অভয় তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘‘আপনার চৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী কে শুনবে ? আমরা একটি পরনির্ভর দেশের অধিবাসী, প্রথমে ভারতবর্ষকে স্বাধীন হতে হবে। তা নাহলে, বৃটিশ শাসনের অধীনে আপনি কিভাবে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রসার করবেন ?’’এটা লক্ষণীয় যে, তিনি কখনও চৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী প্রচারের বিপক্ষে ছিলেন না, কিন্তু তাঁর চিন্তা ছিল এই পথের বাধা-বিপত্তি সম্পর্কে। শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর উত্তর দিয়েছিলন যে, কৃষ্ণভাবনামৃত ভারতীয় রাজনীতির পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করে থাকতে পারে না, আর তা কোন শাসকের উপরও নির্ভরশীল নয়। কৃষ্ণভাবনামৃত এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, তা কোন ব্যক্তি বা বস্ত্তর জন্য অপেক্ষা করতে পারে না। সুতরাং তোমাকে অবশ্যই প্রচার করতে হবে। অভয়চরণ তাঁর বলিষ্ঠতা দেখে স্মম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। অভয়চরণ সকল জাগতিক কার্পণ্য ও শর্ত সরিয়ে রেখে শুধু একটা যথাযোগ্য উপসংহারে এসেছিলেন সেটা হল, কৃষ্ণভাবনামৃত যা সকল জাগতিক সমস্যার একমাত্র সমাধান। শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর প্রভুপাদকে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই অভয় বুঝতে পেরেছিলেন। অভয় তাঁর বন্ধুকে বলেছিলেন, ‘‘উনি এক অপূর্ব পুরুষ। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী প্রচারের ভার এখন এক অত্যন্ত সুদক্ষ মানুষ গ্রহণ করেছেন। যুবক অভয় সেই রাত্রেই শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর প্রভুপাদকে তাঁর গুরুরূপে বরণ করে নিয়েছিলেন। ১৯২৫ সালে অভয়চরণ দে সর্বপ্রথম শ্রীকৃষ্ণের অবসর বিনোদনের স্থান শ্রী বৃন্দাবন ভ্রমণ করেন। ব্যবসায়িক কারণে, অভয় সপরিবারে এলাহাবাদে চলে এসেছিলেন। ঔষুধ বিক্রেতা হওয়ার কারণে অভয়কে ট্রেনে অনেক ভ্রমণ করতে হয়েছিল বিশেষ করে উত্তর ভারতের সর্বত্র। এই সময়, অভয়চরণ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর প্রভুপাদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দীক্ষা নেওয়ার জন্য মানসিক প্রস্ত্ততি নিয়েছিলেন। ১৯৩৩ সালের ২১ নভেম্বর অভয়চরণ দে এলাহাবাদের গৌড়ীয় মঠ থেকে দীক্ষা লাভ করেছিলেন। অভয় তাঁর পারমার্থিক দীক্ষাগুরুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেষ্টা করতেন যখনই তিনি কোলকাতা যেতেন, কিন্তু শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর হয়ত সেখানে থাকতেন না। তাঁর আরও অন্যান্য শিষ্যের মত অভয় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এবং তাঁর পারমার্থিক দীক্ষাগুরুর সরাসরি সংস্পর্শে থাকতে পারতেন না। কাজেই পরবর্তী আরও চার বছর তাঁরা আরও ১২ বার মিলিত হয়েছিলেন। তারপর যখন তাঁরা মিলিত হতেন অভয়চরণারবিন্দ দাস, শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের থেকে প্রবচন শোনার সকল সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করতেন। অন্যান্য দর্শন সম্পর্কে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর অত্যন্ত বলিষ্ঠ যুক্তিবাদী ছিলেন বলে তাঁর শিষ্যরা পর্যন্ত সতর্কভাবে তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন এবং তাঁর সঙ্গে অভয়ের সাক্ষাৎও খুব কম হত, তবু তাঁর সঙ্গে খুব সহানুভূতিপূর্ণ ব্যবহার করতেন। পরবর্তীকালে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন, ‘‘কখনও কখনও আমার গুরুভাইরা, যেহেতু আমি তাঁর সঙ্গে খুব সহজভাবে কথা বলতাম বলে, সমালোচনা করে বলত, দেবদূত যেখানে পদক্ষেপ করতে ভয় পায়, মূর্খরাই সেদিকে বেগে ধাবিত হয়। কিন্তু আমি ভাবতাম, মূর্খ ? ঠিক আছে, হতে পারি, কিন্তু এই আমার পথ। আমার গুরুমহারাজ সবসময় আমাকে গভীর স্নেহ করতেন।’’ (সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী, ১৯৮৭, ‘তোমার সর্বদা শুভাকাক্ষী’, পৃষ্ঠা নং-২০)। ১৯৩৫ সালে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের ৬২ তম জন্মবার্ষিকীর সময় বোম্বেতে তাঁর গুরুভ্রাতাদের এক সম্মেলনে তিনি একটি কবিতা এবং একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। রচনাটি এত সুন্দর হয়েছিল যে, সেটি গৌড়ীয় মঠের পত্রিকা ‘দ্যা হারমোনিস্ট’ এ অচিরেই প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর একজন গুরুভ্রাতা তাঁকে একজন কবি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তথাপি তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনাটি প্রকৃতই সমাদৃত হয়েছিল যখন সেটি শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের কাছে পৌঁছেছিল এবং তাঁকে তা যথার্থ আনন্দ দান করেছিল। বিশেষ করে একটি স্তবক তাঁর এত ভাল লেগেছিল যে, তিনি সেটি তাঁর অতিথিদের দেখিয়েছিলেন-‘পরম ব্রহ্ম পরম পুরুষ প্রমাণ করিলে তুমি। নির্বিশেষের নির্বাণবাদ ত্যাজিল ভারতভূমি’ পরবর্তীতে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর দ্যা হারমোনিস্ট-এর সম্পাদককে বলেছিলেন, ‘‘ও যা লেখে, তাই ছাপিও।’’ ঐ বছর ১৯৩৫ সালে বৃন্দাবনে অভয়চরণের সঙ্গে তাঁর গুরু মহারাজ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের এক তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাৎকার হয়। একসময় শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর যখন অভয়চরণসহ অন্যান্য ভক্তবৃন্দ পরিবৃত হয়ে ভ্রমণ করছিলেন, তখন একসময় তিনি অভয়চরণের সঙ্গে নিভৃতভাবে কিছু কথা বলতে লাগলেন। তিনি বলছিলেন, তাঁর কয়কজন প্রধান ভক্ত কলকাতার গৌড়ীয় মঠের প্রধান কেন্দ্রে (বাগবাজার) কে কোন ঘর এবং বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করবে, তা নিয়ে ঝগড়া করছিল। যদি তারা এখনই এমন ঝগড়া করে, তবে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর অপ্রকট হবার পর তারা কি করবে ? শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর মর্মাহত বোধ করছিলেন। তিনি অভয়কে বলেছিলেন, ‘‘সেখানে আগুন জ্বলবে। একদিন কোলকাতার গৌড়ীয় মঠে আগুন লাগবে এবং দলীয় স্বার্থের এই আগুন ক্রমশ ছড়িয়ে পরে সবকিছু ধ্বংস করবে।’’ অভয়চরণ শুনেছিলেন কিন্তু কিভাবে ক্ষতিপূরণ করবেন তা জানতেন না। শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর বলেছিলেন, ‘‘মন্দিরের দেওয়াল থেকে মার্বেল পাথরগুলি খুলে নিয়ে সেগুলি বিক্রি করে বই ছাপালে অনেক ভাল হবে।’’ এরপর শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর অভয়চরণকে সরাসরি বলেছিলেন, ‘‘আমার কিছু বই প্রকাশ করার ইচ্ছা ছিল। তুমি যদি কোনদিন অর্থ সংগ্রহ করতে পার, বই ছাপিও। (সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী, ১৯৮৭, ‘তোমার সর্বদা শুভাকাক্ষী’,পৃষ
্ঠা নং-২১) শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর এই নশ্বর জগৎ থেকে ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বর মাসে অপ্রকট হয়েছিলেন। তাঁর অপ্রকটের এক মাস আগে, অভয় তাঁকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। তিনি ভাবছিলেন যে গৃহস্থরূপে তিনি তাঁর গুরুমহারাজের পরিপূর্ণ সেবা করতে পারছেন না এবং তাঁর আর কি করার আছে তা তিনি জানতে চান। তিনি এইভাবে প্রশ্ন রেখেছিলেন, ‘‘আমি কি কোন নির্দিষ্ট সেবা করতে পারি ?’’ দু’সপ্তাহ পরে অভয়চরণ চিঠির উত্তর পেলেন আমি স্থির নিশ্চিত যে, যারা বাংলা ও হিন্দি ভাষা জানে না, সেইসব মানুষের কাছে তুমি ইংরেজিতে আমাদের চিন্তা ও যুক্তি ব্যাখা করতে পারবে। আশা করছি তুমি নিজেকে একজন সুদক্ষ ইংরেজি ধর্ম প্রচারকে পরিণত করবে। (সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী, ১৯৮৭, ‘তোমার সর্বদা শুভাকাক্ষী’, পৃষ্ঠা নং-২১)। এটাকে তাঁর লক্ষ্যের চূড়ান্ত অনুমোদন হিসেবে ধরে নিয়ে, অভয়চরণ পুনরায় তাঁর জীবন গঠন শুরু করলেন। ‘মঠে আগুন লাগবে’, এই কথা যা শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, তা অচিরেই সত্য হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। আইনগত বিবাদ চলছিল এবং শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের লক্ষ্য ধূলিস্যাৎ হয়েছিল। ১৯৩৯ সালে গৌড়ীয় মঠ, অভয়চরণ প্রভুকে তাঁর সম্মানার্থে ভক্তিমূলক ডিগ্রী ‘ভক্তিবেদান্ত’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৪৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এ.সি ভক্তিবেদান্ত প্রথম একক প্রচেষ্টায় ইংরেজি সাময়িকী ‘ব্যাক টু গডহেড’ প্রকাশনা শুরু করেন। শ্রীল প্রভুপাদ নিজেই এটা সম্পাদনা করতেন, পান্ডুলিপি লিখতেন, প্ররুফ যাচাই করতেন এমনকি প্রতিটা কপি নিজেই বিতরণ করতেন। ১৯৪৭ সালে ইন্দো-পাক ভয়ংকর সংঘর্ষের মাধ্যমে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করল। ঐ সংঘর্ষের ফলে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুতে ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হয়ে গেল। অভয়চরণ সর্বদা পারমার্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতেন। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন, ‘‘আমরা ১৯৪৭ সালের হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা দেখেছি। একদল ছিল হিন্দু আর একদল ছিল মুসলমান। তারা লড়াই করেছিল এবং হাজার হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছিল। মৃত্যুর পর কে হিন্দু আর কে মুসলমান তা জানার কোন উপায় ছিল না। পৌর প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এসে একসঙ্গে মৃতদেহগুলি নিয়ে কোথাও ফেলে দিত। (সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী, ১৯৮৭, ‘তোমার সর্বদা শুভাকাক্ষী’, পৃষ্ঠা নং-২৩) এই সমস্যা সমাধানে, অভয়চরণ দাস তাঁর ‘ব্যাক টু গডহেড পত্রিকায় গান্ধী-জিন্নাহ সাক্ষাৎকার নিবন্ধটিতে লিখেছিলেন, ‘‘জগৎ ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত হিন্দু-মুসলমান, খ্রিস্টান-খ্রিস্টান, বৌদ্ধ-বৌদ্ধদের মধ্যে লড়াই চলতেই থাকবে। তাঁর যুক্তি ছিল যতদিন পর্যন্ত মানুষ স্বার্থপরতা এবং ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির বাসনার দ্বারা প্রভাবিত থাকবে, ততদিন এই লড়াই চলবেই। পরমেশ্বর ভগবানের সেবা এবং পারমার্থিক উপলব্ধির ভিত্তিতেই কেবল প্রকৃত ঐক্য স্থাপন করা সম্ভব। ১৯৪৭ সালের ৭ ডিসেম্বর অভয়চরণ দিল্লীতে গান্ধীজীকে একটি দীর্ঘ পত্র লিখেন। অভয়চরণ জানতেন যে তাঁর চিঠিটি কখনই গান্ধীজীর কাছে পৌঁছাবে না, তবুও এটি পাঠিয়েছিলেন। নিজেকে গান্ধীজীর একজন অজ্ঞাত পরিচয় হিতাকাক্ষী হিসাবে পরিচয় দিয়ে অভয়চরণ লিখেছিলেন, ‘‘আমি আপনার একজন সচেতন বন্ধু হিসেবে বলছি, যদি আপনি খুব কলঙ্কজনক ভাবে মৃত্যুবরণ করতে না চান, তাহলে শীঘ্রই সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করুন।’’ অভয়চরণ তাঁর পত্রের উত্তরে একটি পত্রও পাননি এবং ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধিজী গুলিবিদ্ধ হন, তাঁর চিঠিটি ভবিষ্যৎবাণীর মত সত্যি হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী কয়েক বছর অভয়চরণ ব্যবসার কাজে কম এবং লেখালিখি ও প্রচারের কাজে বেশি বেশি নিয়োজিত হচ্ছিলেন। ঝাঁসীর হাসপাতালের একজন সহকর্মী তাঁকে গীতামন্দিরে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করেছিল। শ্রোতাদের অধিকাংশই ছিল ছাত্র এবং বুদ্ধিজীবী এবং তাদের সেই স্বীকৃতি ছিল সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক। অনেক বক্তা আসলেন এবং চলে গেলেন। কিন্তু অভয়চরণ দূরদৃষ্টি পরায়ণ এবং উচ্চাকাক্ষী ছিলেন এবং পুত্রের হাতে এলাহাবাদের কার্যভার অর্পণ করে তিনি ঝাঁসীতে একটি পারমার্থিক আন্দোলন শুরু করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। এটা ছিল ‘ভক্ত সংঘ’।
১৯৫০ সালে অভয়চরণ পারিবারিক জীবন থেকে অবসর নেন এবং বানপ্রস্থ আশ্রম গ্রহণ করেন। যদিও প্রকৃত অর্থে অবসর নেননি এবং তখন তিনি গ্রন্থ লেখা ও পড়ার কাজে নিবেদিত হলেন। ১৯৫৩ সালে ঝাঁসীতে তিনি তাঁর প্রথম শিষ্যকে দীক্ষিত করেন। ঝাঁসীতে তার নিজস্ব কেন্দ্র ও ভক্তসংঘের শুভ উদ্বোধন হল ১৬ মে। ১৯৫০ সালটি ছিল অভয়চরণের পক্ষে খুবই খারাপ সময়। তাঁকে তাঁর ভক্ত সঙ্গের বাসভবনটি ছেড়ে দিতে হয়েছিল কারণ রাজ্যপালের স্ত্রী সেখানে একটি নারী সমিতি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। থাকবার কোন জায়গা না পাওয়ায় এবং যথাযোগ্য সহায়তা না পাওয়ার জন্য তিনি ঝাঁসী ত্যাগ করেছিলেন, কিন্তু বিশ্বব্যাপী ভক্ত সংঘ গড়ে তোলার পরিকল্পনাটি পরিত্যাগ করেননি। দিল্লীতে একটি আশ্রমে গিয়ে তাঁর গুরু ভ্রাতাদের সঙ্গে কিছুদিন বসবাস করার পর, তিনি বুঝেছিলেন তিনি তখন একা একজন ভিক্ষুকের মত বিভিন্ন মন্দিরে অথবা ধর্মপরায়ণ ধনী যে পরিবারগুলি তাঁকে আপ্যায়ন করত, তাঁদের বাড়িতে থাকছিলেন। অর্থ, সাধারণ বস্ত্র, প্রাপ্য সামান্য খাদ্যের ঐ কঠিন সময় তাঁকে আরও বেশি সমৃদ্ধশালী করেছিল। তিনি সেসব সমস্যাকে সম্পদ হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। (সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী, ১৯৮৭, ‘তোমার সর্বদা শুভাকাক্ষী’, পৃষ্ঠা নং-২৪)। জাগতিক সুখন্ডসুবিধার উপর তিনি তেমন কোন গুরুত্ব দেননি কিন্তু তাঁর বিশ্বাসের উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর কেউ ছিল না, তিনি ছিলেন একেলা। পরিবার ও বন্ধু-বান্ধব দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর জাগতিকভাবে ব্যর্থ তাঁর একমাত্র প্রবোধ ছিল তাঁর গুরুমহারাজের উদ্দেশ্য পূরণ। ‘‘তাঁর কেউ ছিল না, তিনি ছিলেন একা।’’ সেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তিনি অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের শরণাপন্ন হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে তৎকালীন ভারতের প্রেসিডেন্ট ডা. রাজেন্দ্রপ্রসাদও ছিলেন, কিন্তু তিনি কোন উত্তর পাননি। ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে দিল্লী থেকে ৮০ মাইল দক্ষিণে শ্রী বৃন্দাবন ধামে চলে যান এবং তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের তীব্র প্রস্ত্ততি এবং অধ্যাপনা শুরু করেন। অভয়চরণের পরিকল্পনা ছিল যে, তিনি বৃন্দাবনের শান্ত, আধ্যাত্মিক পরিবেশে বসে গ্রন্থ রচনা করবেন এবং তাঁর সমস্ত সাহিত্য বিতরণ করা ও সম্মানিত পৃষ্ঠপোষকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করবার জন্য দিল্লীর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। গুরু এবং কৃষ্ণের উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাসের কারণে তিনি সর্বদা তাঁদের করুণা প্রার্থনা করতেন। প্রতিদিন অভয়চরণ গ্রীষ্মের ৬০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় বৃন্দাবন ও দিল্লী যাতায়াত করতেন। যমুনার তীরে বংশী-গোপালজীর মন্দিরে তিনি খুব স্বল্প ভাড়ায় খুব সাধারণ একটি ঘরে থাকতেন এবং এই বৃন্দাবনেই তিনি এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যসূচক জীবনধারণ করতেন। দিল্লীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা খুব কঠিন হয়ে উঠছিল, তিনি সকালের ট্রেনে দিল্লী যেতেন এবং সেখানে কোথাও থাকবার জায়গা না থাকায়, সেই রাত্রেই বৃন্দাবনে ফিরে আসতেন। তার ফলে তিনি দিল্লীতে বেশি সময় থাকতে পারছিলেন না এবং সবকিছু অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল যে, সকল টাকাই একটি কাজে খরচ হয়ে যেত এবং পরবর্তী কাজে কিছু অবশিষ্ট থাকত না। তা সত্ত্বেও তিনি যাতায়াত খরচ, গ্রন্থ প্রকাশ এবং সেগুলি ডাকযোগে পাঠাবার কাজ করে চলছিলেন। ক্রমান্বয়ে পাক্ষিক ‘ব্যাক টু গডহেড’ এর বারটি সংখ্যা প্রকাশের পর, অভয়চরণের টাকা শেষ হয়ে গেল। মুদ্রক বলেছিলেন, কেবল বন্ধুত্বের খাতিরে তিনি আর ছাপাতে পারবেন না। অভয়চরণ তারপরও লিখে যাচ্ছিলেন, যদিও সেগুলি প্রকাশের কোন পরিকল্পনা তাঁর ছিল না। অনেক বছর তাঁর পরিবারকে সাহায্য ও সমর্থনের জন্য সংঘর্ষ করে অবশেষে ১৯৫৪ সালে এ.সি ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ তাঁর পরিবারকে ত্যাগ করে তাঁর জীবনকে গুরুমহারাজের আদেশ পালন করার উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত করেন। শ্রীল প্রভুপাদ দিল্লীতে প্রচারের উদ্দেশ্য প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। এ.সি ভক্তিবেদান্ত স্বামী তাঁর নির্দিষ্ট প্রধান উদ্দেশ্যে অটল থেকে দিল্লীর ছিপিওয়াদা মন্দিরে বসে বেদব্যাসের বেদান্তসূত্রের উপর শ্রদ্ধাশীল থেকে শ্রীমদভাগবতের তাৎপর্য রচনার মাধ্যমে বজ্রকঠিন হৃদয় দিকভ্রান্ত পৃথিবীর মানুষের কল্যাণে দিবা-রাত্র টাইপ করে চলছিলেন। শ্রীল এ.সি ভক্তিবেদান্ত স্বামী গভীর মনোযোগ ও নিষ্ঠার সঙ্গে এটি শেষ করার চেষ্টা করছিলেন। কিছুদিন পর তিনি শহরের রাধা-দামোদর মন্দিরে চলে আসেন।